বিনোদন

‘তাপসকে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলেছিলেন দিদি’

ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। এর মধ্য দিয়ে দেড় দশকের ক্ষমতার মসনদ হারিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেকে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝারছেন। এবার ক্ষোভ উগড়ালেন, প্রয়াত অভিনেতা তাপস পালের স্ত্রী নন্দিনী।   

রোজ ভ্যালি কাণ্ডে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য তাপস পালকে কারাভোগ করতে হয়েছে। ২০২০ সালে মারা যান তিনি। স্বামীকে নিয়ে নন্দিনী বলেন, “তাপস ধান্ধাবাজ মানুষ ছিল না। ওর একটাই সমস্যা ছিল, কোনো কিছু মাথা দিয়ে চালনা করত না, সবটাই অন্তর দিয়ে ভাবত। তাই তাকে মাশুল গুনতে হয়েছে।” 

মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তাপস পালের রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে নন্দিনী জানান, তখনো তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হয়নি। সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে লাল পতাকার দাপট। নব্বইয়ের শেষের দিকে টালিগঞ্জের কোনো তারকাই মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে ছিলেন না। তখন বহুবার তাপসের সঙ্গে দেখা করতে তাদের বাড়ি গিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী।  

তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য তাপসের সংগ্রাম ও তাপসের প্রতি দলের উদাসীনতার কথা স্মরণ করে নন্দিনী বলেন, “ছোট থেকেই মানুষের জন্য ভাবত তাপস। তার পরে তো দিদির অনেক অনুরোধে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিল। তখন বামফ্রন্ট সরকার। সেই সময়ে ওর যত সিনেমা বেরোত, তা চলতে দেওয়া হতো না। অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। খুব কঠিন সময়ে ওকে মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। প্রাণ দিয়ে কাজ করেছিল তাপস। কিন্তু শেষে দলের কাউকে নিজের পাশে পায়নি।” 

গরুপাচার, চিটফান্ড নিয়ে স্বর তুলেছিলেন তাপস। কিন্তু প্রতারণা করেন মমতা ব্যানার্জি। এ তথ্য উল্লেখ করে নন্দিনী বলেন, “ক্ষমতায় আসার পরে দিদি (মমতা ব্যানার্জি) ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যান। তখন তাপসের প্রয়োজন দিদির কাছে ফুরিয়ে যায়। চিটফান্ডের কোনো টাকা আত্মসাৎ করেনি তাপস। ও পরিস্থিতির শিকার ছিল।” 

চৌমুহায় তাপস যে কথা বলেছিলেন, তা অবশ্য মানতে নারাজ নন্দিনী ও তাদের কন্যা সোহিনী পাল। পরবর্তীতে অভিনেতা নিজেও অনুভব করেছিলেন, তিনি ভুল করেছেন। এ বিষয়ে নন্দিনী বলেন, “চৌমুহাকাণ্ডে তাপসের মন্তব্য—ওই একটাই ভুল ছিল। মা-বাবাকে দেখেননি, আমাদের সম্পর্ক ঠিক নেই—এসব ভুল তথ্য রটানো হয়েছিল। ওর ভাগ্য খারাপ।” 

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদল জরুরি ছিল বলে মনে করেন নন্দিনী। তার ভাষ্য—“এত দিন রাজ্য চালানো হচ্ছিল না, একটা ক্লাব চালানো হচ্ছিল। দিদি আর দল তাপসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। দিদি যেভাবে রাজ্য শাসন করলেন, তার থেকে বামফ্রন্ট শাসন ভালো ছিল, এমনকি ইংরেজ শাসনও ভালো ছিল। ব্যবহার করে তাপসকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল দিদি।” 

মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন তাপস। কিন্তু ফোন ধরেননি মমতা। নন্দিনী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারবেন না। এসব তথ্য স্মরণ করে নন্দিনী বলেন, “একবার ফোনে কথা বলতে চেয়েছিল তাপস। দিদি ফোন তোলেননি। আমি চাই দিদি অনেক বছর বেঁচে থাকুন, যাতে উপলব্ধি করতে পারেন কী কী ভুল করেছেন।”  

২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মারা যান ভারতীয় বাংলা সিনেমার দাপুটে অভিনেতা তাপস পাল। ব্যক্তিগত জীবনে নন্দিনী পালের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিলেন। এ দম্পতির একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিট নিয়ে দুইবার বিধায়ক এবং দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তাপস পাল। 

১৯৫৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হুগলির চন্দননগরে জন্মগ্রহণ করেন তাপস পাল। ১৯৮০ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘দাদার কীর্তি’ মুক্তি পায়। সব মিলিয়ে ৭২টি সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। তার অভিনীত শেষ সিনেমা ‘খিলাড়ি’। এটি মুক্তি পায় ২০১৩ সালে। 

তাপস পাল অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে—‘অনুরাগের ছোঁয়া’, ‘চোখের আলোয়’, ‘সুরের আকাশ’, ‘ঋণমুক্তি’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’, ‘অমর বন্ধন’, ‘বৈদুর্য রহস্য’, ‘গুরুদক্ষিণা’, ‘অজান্তে’, ‘তুমি যে আমার’, ‘রাজার মেয়ে পারুল’, ‘পাপপুণ্য’, ‘নয়নমণি’, ‘মায়াবিনী’, ‘তবু মনে রেখ’, ‘উত্তরা’, ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’, ‘শুভকামনা’।