বিনোদন

ইস! মা যদি এখন পাশে থাকতেন: দিলারা জামান

চিরায়ত বাঙালি মা রূপে রুপালি পর্দায় বরেণ্য অভিনেত্রী দিলারা জামানকে দেখে মুগ্ধ হননি, এমন দর্শক পাওয়া দুষ্কর। তার মমতাময়ী মুখ, কণ্ঠে লেগে থাকে মায়ের চিরন্তন রূপ। বহু আগে গত হয়েছেন দিলারা জামানের মা সিতারা বেগম। মায়ের সঙ্গে অভিনেত্রীর স্মৃতিগুলো এখনো ঝলমলে-প্রাণবন্ত। মা ও কন্যাদের নিয়ে কথা বলেছেন ৮৫ বছর বয়সি দিলারা জামান। আলাপচারিতায় তার সঙ্গে ছিলেন রাইজিংবিডির সহকারী বার্তা সম্পাদক—আমিনুল ইসলাম শান্ত।    রাইজিংবিডি: ‘মা দিবস’ উদযাপনকে কীভাবে দেখেন? দিলারা জামান: বাংলাদেশের মা সবসময়ই মা। বাইরের যে সংস্কৃতি, সেই সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আমরা বিভিন্ন দিবস বানিয়েছি। মা দিবস, বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি। আমি কাজ করে যখন রাতে ফিরি, তখন দেখি ট্রাকের ওপরে একজন মা শ্রমিক। সে সারা দিন কাজ করে এসে চাল-ডাল কিনে, তারপর নিজের ক্লান্তি ভুলে রান্নাবান্না করে, সেই অন্নটা তার সন্তানের মুখে দেয়। এখানেই এই মায়ের শান্তি। সে মা দেখেই এটা পারে! বাংলাদেশের মায়েদের কাছে প্রতিদিনই মা দিবস। আলাদা করে মা দিবস পালন করার আমি কোনো বিশেষত্ব দেখি না। বিশেষ করে আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আমাদের যে যাপিত জীবন, সেখানে সবকিছুই আলাদা। মায়া-ভালোবাসার বন্ধনটাও অন্যরকম। 

রাইজিংবিডি: ‘মা’ শব্দটি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? দিলারা জামান: ‘মা’ শব্দটি ব্যাখ্যা করে শেষ করা যাবে না। মাকে ধরিত্রীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। ধরিত্রী যেমন আমাদের এত অত্যাচার, এতকিছু সহ্য করে, মা-ও তেমন সন্তানের জন্য সবকিছু সহ্য করেন; তার ত্যাগ-তিতিক্ষা, আশা-স্বপ্ন সবকিছু সন্তানকে ঘিরে। এজন্য মা ও দেশ একই।

রাইজিংবিডি: আপনার মাকে নিয়ে জানতে চাই— দিলারা জামান: মা তো এখন আর নেই, যখন ছিলেন তখন হয়তো মায়ের অনুপস্থিতি বুঝতে পারিনি। যখন নিজে মা হলাম, তারপর বুঝতে পারলাম মা কতটা কষ্ট করেছেন। 

রাইজিংবিডি: নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে জীবন বহমান। জীবনের কোন পরিস্থিতিতে মাকে আপনার খুব বেশি মনে পড়ে?  দিলারা জামান: এই পৃথিবীতে মায়ের মতো নিঃস্বার্থ কেউ না। ফলে সব পরিস্থিতিতেই মাকে মনে পড়ে। আগে বুঝিনি, এখন যত বয়স হচ্ছে, ততই মায়ের অনুভব, মায়ের কথা বেশি মনে পড়ে। আর মা হয়ে সেটা আরো বেশি বুঝতে পারছি। এখন সবরকম ভালো ও মন্দ পরিস্থিতিতে মনে হয়—“ইস! এখন যদি মা পাশে থাকতেন অনেক বেশি খুশি হতাম।” এই বয়সেও যখন কোনো দুঃসময় আসে, তখন মনে হয়—মা বেঁচে থাকলে এখন সান্ত্বনা হয়ে পাশে থাকেতেন বা শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়াতেন। মা পাশে থাকলেই বড় শক্তি পাওয়া যায়। মা এখন অনুভবে আছেন। 

রাইজিংবিডি: সন্তান তার জীবনের বড় একটি অংশ মায়ের সান্নিধ্যে কাটায়। আপনার মায়ের সঙ্গে কাটানো কোন মুহূর্তটি আপনাকে ভীষণ আবেগতাড়িত করে? দিলারা জামান: একটি ঘটনা আলাদা করে দেখি না। অনেক ঘটনা, অনেক ভালোবাসা, অনেক মায়া আছে। মা তার ভালো ভালো শাড়িগুলো আমার জন্য আলাদা করে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কবে এগুলো করেছেন আমি জানতামই না। এটা আমার বিয়ের সময়ে জানতে পারি। কবেকার সেই শাড়ি আমার জন্য রেখে দিয়েছেন। এখন তো অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা তৈরি হয়েছে। আমি যখন সন্তানের মা হই, তখন তো ডায়াপারা ছিল না। আমি মা হওয়ার পর দেখি, বাচ্চার জন্য আমার মা কাঁথা সেলাই করে রেখেছেন। এসব তো আমি আমার মাকে কখনো বলিওনি। তিনি নিজে থেকেই এসব প্রস্তুত করে আমার জন্য আনেন। তিনি মা বলেই অনুভব করেছেন, আমার মেয়ের এসব প্রয়োজন হবে। আমি থাকতাম গোপীবাগে, মা-বাবা থাকতেন লালবাগে। ছুটির দিনে ভালো কিছু রান্না হলে, তা টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে নিয়ে আসতেন। মা বলেই উনি এসব করেছেন।     

রাইজিংবিডি: আপনার জীবন, ক্যারিয়ারে আপনার মায়ের ভূমিকা কতটা? দিলারা জামান: আজকের দিলারা জামান হয়ে ওঠার পেছনে, শৈশবে বীজটি মা বপণ করে দিয়েছেন। এই শিল্পকে ভালোবাসাটাও আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। তার অপূর্ণ স্বাদগুলো আমার ভেতর দিয়ে পূর্ণ করতে চেয়েছেন। আমরা যখন এই অঙ্গনে কাজ শুরু করি, তখন সমাজে বাধা-বিপত্তি ছিল। এ নিয়ে মাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আর আমার বাড়ি তো নোয়াখালীতে। খুব কনজারভেটিভ পরিবারে আমার জন্ম। মাকে মানুষ বলতেন, “মেয়ে নাচ করে, গান করে, নাটক করে এখন বিয়ে দেবে কোথায়?” এসব সহ্য করেই তিনি আমাকে নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছেন। মা না থাকলে আমি এতদূর আসতে পারতাম না।  

রাইজিংবিডি: আপনি দুই সন্তানের জননী। আপনার ক্যারিয়ারে আপনার সন্তানদের ভূমিকা কতটা? দিলারা জামান: মায়ের পরে আমার স্বামী আমাকে কাজে প্রেরণা দিয়েছে। আমার দুই কন্যা, তাদেরও আমার জন্য ত্যাগ আছে। কারণ তারা দিনের পর দিন দেখেছে, মা কাজ করতে যায়, আসতে রাত হয়। সেই সময়ে টেলিফোন ছিল না, হয়তো এমন জায়গায় শুটিং করতে গিয়েছি, যেখানে কোনো ফোন নাই। ফলে ফোন করে বলতেও পারি নাই, আজকে দেরি হবে। রাতে বাসায় ফিরে দেখি, মেয়েরা ঘুমিয়ে গেছে। পরের দিন সকালে যখন শুটিংয়ের জন্য বের হতাম, তখনো দেখতাম মেয়েরা ঘুমাচ্ছে। এমনও হয়েছে দু-তিন দিন ওদের সঙ্গে আমার কথাও হয়নি। আমি বলব, আমার ক্যারিয়ারে পরিবারের সবারই অবদান আছে। আমি গ্রুপ থিয়েটার করতাম। নাটকের দল নিয়ে কয়েক দিনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতাম। বাসায় রান্না করে রেখে যেতাম, কখনো মেয়েরা ডিম বাজি, ডাল দিয়ে খেয়ে নিত। কিন্তু ওরা কখনো দ্বি-মত করেনি। কিংবা বলেনি, ‘আমাদের কষ্ট হয়, আমাদের রেখে তুমি কেন বাইরে যাও।’ আর ওরা মেয়ে বলেই হয়তো ব্যাপারটি বেশি বুঝতে পেরেছে, মাকে সঙ্গ দিয়েছে, মায়ের কাজকে উৎসাহ দিয়েছে। 

রাইজিংবিডি: আপনার দুই মেয়েই বিদেশে বসবাস করেন। দূরদেশে থেকেও আপনাদের মা-মেয়ের বন্ধন কতটা ভালোবাসাময়?  দিলারা জামান: আমার মেয়েরা এখন মায়ের ভূমিকাতেই আছে। ওরা দূরে থাকে, এত দূরের জার্নি আমি করতে পারি না। ৩২-৩৩ ঘণ্টার জার্নি। ওরা ওদের ছুটিগুলো জমায়। ওদের বেশি ছুটি নাই। ১০ দিন ছুটি, তার সঙ্গে ডে-অফ ডিউটি বা অন্য ছুটি জমিয়ে দু-তিন সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে এসে আমার কাছে থেকে যায়। কিছু দিন আগে ছোট মেয়ে এসেছিল আমেরিকা থেকে, ১৫ দিন থেকে গেছে। ঈদুল আজহার পরে বড় মেয়ে দেশে আসবে। বড় মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ায়, তখন ওর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে। এবার আসলে ও হয়তো ১ মাস আমার কাছে থাকবে, শ্বশুরবাড়ি যাবে। এত দূর থেকে মেয়েরা আসে, এটা তো মায়ের ভালোবাসার জন্য, মাকে দেখার জন্য। এখন তো বিমানের টিকিটের মূল্যও তিন-চার গুণ বেড়ে গেছে। তারপরও মাকে দেখতে ওরা আসে। 

রাইজিংবিডি: আপনার মূল্যবান সময় রাইজিংবিডিকে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। দিলারা জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ। অন্য কোনো দিন দেখা হবে, ভালো থাকবেন।