অনেক সময় খ্যাতির আলো মানুষকে দূরের মানুষে পরিণত করে। কিন্তু পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছেন, যারা যত বড় হন, তারা ততটাই সহজ, মানবিক ও বিনয়ী হয়ে ওঠেন। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম তাঁদেরই একজন। তাঁর গান যেমন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনই তাঁর ব্যক্তিত্বও হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়া আমি যাব’, ‘যদি বউ সাজো গো’, ‘আজকে না হয় ভালোবাস আর কোনো দিন নয়’, ‘এই আকাশকে সাক্ষী রেখে’, ‘পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার’ কিংবা ‘বন্দী পাখির মতো’—খুরশীদ আলমের গাওয়া এই গানগুলো এখনো তুমুল জনপ্রিয়। মানুষটির সঙ্গে আমার কিছু স্মৃতি আজও আলতো আলো হয়ে জ্বলছে; যা আমাকে ভীষণভাবে আন্দোলিত করে।
বরেণ্য শিল্পী খুরশীদ আলম ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়—২০১৪ সালে। রাজধানীর বিজয়নগরের হোটেল ৭১-এ একটি গানের অনুষ্ঠানে। চারপাশে উপস্থিত শিল্পীরা, আলোকচ্ছটা, ব্যস্ততায়মুখর ছিল পুরো পরিবেশ। সেই ভিড়ের মাঝেই প্রথমবার সামনে থেকে দেখার সুযোগ পাই খুরশীদ আলম ভাইকে। অন্যদের মতো সেদিন আমিও একটি ছবি তুলেছিলাম তাঁর সঙ্গে। তখনো বুঝিনি, মাটির মানুষটিকে নিয়ে আমার স্মৃতির খাতায় এতগুলো উষ্ণ অধ্যায় জমা হবে।
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলমের সঙ্গে লেখক। ছবিটি ২০১৪ সালে তোলা
এ ঘটনার কয়েকদিন পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম সাক্ষাৎকার নিতে। সেদিনের অভিজ্ঞতা আজও আমাকে বিমোহিত করে, মুগ্ধতার ঘোর কাটতেই চায় না। এত বড় একজন শিল্পী অথচ কী ভীষণ সহজ-সরল জীবন তার! কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো দূরত্ব নেই। পরিবারের একজন মানুষের মতো লুঙ্গি পরেই সাক্ষাৎকার দিতে বসেছিলেন। তখন টেলিভিশনের বাইরে ভিডিও সাক্ষাৎকারের চল তেমন ছিল না। কিন্তু তাঁর গল্পের ভাণ্ডার ছিল অফুরন্ত। কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল, খ্যাতিমান কোনো ব্যক্তি নয় বরং একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়র সঙ্গে বসে গল্প করছি। তাঁর আন্তরিকতা আমার হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
২০২৩ সালের ৩ জুন, সংগীতশিল্পী ঐশীর বিয়ের অনুষ্ঠানে খুরশীদ আলম ভাইয়ের সঙ্গে আবারো দেখা। বলা যায়, ভাগ্যরেখার বদৌলতে মুহূর্তটি পেয়েছিলাম, সেদিনের ছোট্ট একটি ঘটনা আজও আমাকে নাড়া দেয়। ফুচকা নেওয়ার জন্য সেদিন লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এমন সময় খুরশীদ আলম ভাই এলেন। সম্মান জানাতে আমি লাইন ছেড়ে তাকে আগে নেওয়ার সুযোগ করে দিই। কিন্তু প্লেট হাতে পেয়েই তিনি তা আমার হাতে তুলে দেন। অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে আমার আগে দিতে পারিনি। বড় মানুষেরা হয়তো এমনই হন! সম্মান নিতে জানেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জানেন সম্মান দিতে!
গত বছর রাইজিংবিডির অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম খুরশীদ আলম ভাইকে। নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে পৌঁছান। এক বছর পর ফের অফিসে আমন্ত্রণ করি খুরশীদ আলম ভাইকে। এবারো তাই হলো। পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি উপস্থিত হলেন। ব্যস্ততার এই সময়ে এমন সময়নিষ্ঠা সত্যিই বিরল! অফিসে পৌঁছে কোনোভাবে শুনেছিলেন, আমি দুপুরের খাবার খাইনি। শিশুর মতো আন্তরিক কণ্ঠে বারবার বলছিলেন, “আগে খেয়ে নিন।” আমি খাওয়া শেষ করে টক শোতে বসি। তারপর যেন খুলে গেল স্মৃতির ঝাঁপি। গান, জীবনের গল্প, সংগ্রাম, হাসি—সব মিলিয়ে অন্যরকম এক আড্ডা।
আড্ডা শেষ হতে না হতেই বাইরে ঝুম বৃষ্টি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আরো কিছুটা সময় কাটল। তারপর বাসার উদ্দেশে রওনা দিলেন। কিছুক্ষণ পর আমার ফোন বেজে ওঠে। ওপাশে খুরশীদ আলম ভাই। ফোনে জানালেন, তিনি নিরাপদে বাসায় পৌঁছেছেন। একজন কিংবদন্তি শিল্পীর এমন দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বড় শিল্পী হওয়া মানে কণ্ঠের শক্তি নয়, বরং নম্র, মানবিক মানুষ হওয়াতে নিহিত; যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগায়।
ঐশীর বিয়েতে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলমের সঙ্গে লেখক
খুরশীদ আলম ভাই, আপনি দীর্ঘজীবী হোন। সুরের ভুবনে আপনার বিচরণ হোক আরো দীর্ঘ, আরো বর্ণিল। আপনার গান যেমন আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, তেমনই আপনার এই অসাধারণ মানবিকতাও থেকে যাবে আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর স্মৃতি হয়ে।