শৈশবে নাচে হাতেখড়ি; তারপর থিয়েটার ও র্যাম্প মডেলিংয়ের মাধ্যমে শোবিজ অঙ্গনে আবির্ভূত হন সুনেরাহ বিনতে কামাল। চলচ্চিত্রে পা রেখেই তাক লাগিয়ে দেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেত্রী। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত জীবন ও ঈদস্মৃতি নিয়ে খোলামেলা কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস।
রাইজিংবিডি: সম্প্রতি শেষ হলো ‘এটা আমাদেরই গল্প’। এ নাটকে দর্শক প্রতিক্রিয়া কেমন পাচ্ছেন?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: যেখানেই যাচ্ছি সবাই ‘সায়রা’ নামে ডাকছে। বয়স্কদের পাশাপাশি বাচ্চারাও এমন করছে। সম্প্রতি কক্সবাজারে শুটিং করছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ আমাকে টোকা দেয়, ঘুরে দেখি—পিচ্চি একটা বাবু। সে বলছে, ‘তুমি সায়রা আপু না?’ তারপর আরেকদিন মিটিংয়ের জন্য আমি আর ইরফান একটি রেস্তোরাঁয় গেলাম, ওখানে বয়স্ক একজন আন্টি ও আঙ্কেল অনেকক্ষণ বসেছিলেন, যাওয়ার সময় তারাও কাজটির প্রশংসা করলেন। বিষয়গুলো ভালোই লাগে।
রাইজিংবিডি: ছোটবেলার ঈদের কথা জানতে চাই।
সুনেরাহ বিনতে কামাল: সাধারণত দাদুবাড়ি বা নানুবাড়িতে ঈদ কাটাতাম। তবে কোরবানি ঈদ বেশিরভাগ সময় দাদুবাড়িতেই কেটেছে। সেখানে সব ভাই-বোন ও কাজিনরা থাকত। কোরবানি দেওয়ার পরে আমাদেরও কিছু মাংস কাটতে দেওয়া হতো— ব্যাপারটি বেশ মজার ছিল। এখন তো আর যাওয়া হয় না; কাজে ব্যস্ত থাকি। সাধারণত, ঈদের দিন এখন বাসাতেই কাটাই।
রাইজিংবিডি: শৈশবে কোরবানি ঈদের বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল, কোরবানির পর সবাই মিলে বড় পাতিলে মাংস রান্না করা। আমরা অপেক্ষা করতাম, কখন রান্না শেষ হবে, কখন আমরা খাব। মাংস একটু সেদ্ধ হয়ে আসলে বড়রা কিছু মাংস তুলে দিত বাচ্চাদের খাওয়ার জন্য, আর রান্না পুরোপুরি শেষ হলে সবাই মিলে একসঙ্গে খেতাম। বড় হওয়ার পর আর এই বিষয়টি কখনো পাইনি। এত স্মৃতি জমে আছে যে, সুনির্দিষ্টভাবে কোনটি বলব? তবে সবাই মিলে এক হওয়া, গল্প করা, সময় কাটানো—এগুলো মিস করি। এখন এসব হয়ে ওঠে না।
রাইজিংবিডি: কোরবানির পশু কিনতে কখনো হাটে গিয়েছেন?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: হ্যাঁ, ছোটবেলায় হাটে গিয়েছি। গরু দেখে খুব এক্সাইটেড হতাম। পছন্দ করতাম। তবে, আমার একটা সমস্যা আছে, আমি কোরবানি দেওয়া দেখতে পারি না। কারণ আমার অনেক খারাপ লাগে, মায়া লাগে। আমি যদি গরু কোরবানি দিতে দেখে ফেলি, তাহলে সেই গরুর মাংস আর খেতে পারি না।
রাইজিংবিডি: এ পরিস্থিতিতে পরিবারের লোকজন আপনাকে কীভাবে সামলাতেন?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: তখন আমাকে পাশের বাসার কোরবানির মাংস বা পড়শিদের বাসার মাংস বলে খাওয়ানো হতো। বাড়ির লোকজন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন—‘এটা আল্লাহর নিয়ম, এটাই ত্যাগ। এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্যই এই নিয়ম।’ বড় হওয়ার পর বিষয়গুলো আমিও বুঝতে পেরেছি। সত্যি বলতে, জীবনে একেকটা সময় একেকভাবে আসে। যেটা রিয়েলিটি সেটা মেনে নিতে হবে। তবে আগে যা ছিল, সত্যিই খুব সুন্দর ছিল, এখন যেভাবে সুযোগ হয় সেভাবেই ঈদ উদযাপন করি।
রাইজিংবিডি: ঈদের খাবারের মেন্যুতে কোন খাবারটা আপনার বিশেষ পছন্দ? নিজে রান্না করেন?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: গরুর মাংস আর পোলাও। আগে নিজে রান্না করতাম। এখন সময়ের অভাবে তেমন করা হয় না। আম্মুই সব করেন। আমি মাঝেমধ্যে ‘ঝুড়া বিফ’ করি। এটি আমার খুব পছন্দের একটি ডিশ।
রাইজিংবিডি: ঈদের সালামি নিয়ে কোনো মজার স্মৃতি?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: কোরবানি ঈদে সালামি নেওয়ার প্রথাটা আমাদের বাসায় ওভাবে ছিল না। রোজার ঈদে সালামির ব্যাপারটা থাকত। সালামি ছোটবেলায় নানুর বাসায় বেশি পেতাম। দাদুর বাসায় সবাই একটু কম পরিমাণে দিতেন। তাই বেশি সালামির আশায় নানুবাড়িতে চলে যেতে চাইতাম।
রাইজিংবিডি: আপনাকে দেখে অনেকেই রাগী মনে করেন, বাস্তব জীবনে আপনি কেমন?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: আমি একদমই রাগী না। আমি একটু চুপচাপ থাকি, সবার সঙ্গে কথা বলতে পারি না। আসলে আমার চেহারাটাই এমন যে, দূর থেকে রাগী মনে হয়। আমি আসলে অনেক লাজুক স্বভাবের। কারো সঙ্গে কথা বলে কমফোর্টেবল হতে একটু সময় লাগে। কিন্তু একবার কথা বললে সবাই বুঝতে পারেন—আমি আসলে রাগী নই।
রাইজিংবিডি: ঈদের শপিং নিয়ে আলাদা করে কোনো পরিকল্পনা থাকে কিনা?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: না, আমার ওইরকম কোনো প্ল্যান থাকে না। ঈদে সবাইকে কিনে দিতে ইচ্ছা করে, দেইও। নিজের জন্য কেনাকাটা করার চেয়ে আব্বু-আম্মু বা ভাই-বোনদের জন্য কিনতেই বেশি ভালো লাগে। নিজের জন্য এখন আর ওরকম অনুভূতি হয় না। ছোটবেলায় নিজের শপিং নিয়ে আলাদা আবেগ ছিল, কিন্তু এখন সেই ব্যাপারটা আর নেই।
রাইজিংবিডি: একজন শিল্পী হিসেবে ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: আমার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা ওপরে পৌঁছানোর প্রেসার নেই। আমি শুধু সুস্থ ও সুন্দর থেকে আমার প্রত্যেকটা কাজে সেরাটা দিতে চাই। রেজাল্ট কী হবে তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমি জার্নিটা কীভাবে করছি। আমি বিশ্বাস করি, যেটা হওয়ার সেটা হবেই। এরকম যদি থাকে যে, আমার ওখানে পৌঁছাতে হবে, তখন খুব প্রেসার হয়ে যায়। কাজগুলো মনোযোগ দিয়ে করা যায় না। কাজই আমার কাছে প্রিয়। তাই আমি সুস্থ থাকার চেষ্টা করি। আমরা তো অ্যাক্টর, আমাদের সুস্থ থাকা, ফিজিক্যালি ফিট থাকা জরুরি।
রাইজিংবিডি: ঈদুল আজহায় ভক্তদের কী বার্তা দিতে চান?
সুনেরাহ বিনতে কামাল: ঈদ আমাদের বড় ধর্মীয় উৎসব। সবাই যাতে মিলেমিশে থাকেন, এনজয় করেন এবং নিজেদের যতটুকু দায়-দায়িত্ব, ততটুকু পালন করেন সেটাই কাম্য। বিশেষ করে আশেপাশে সবাইকে মেন্টালি পজিটিভ রাখাটা খুব জরুরি, এই জিনিসিটা সবার করা উচিত বলে মনে করি।