অভিনয়, সাহিত্যচর্চা, নৃত্য কিংবা চিত্রাঙ্কন—সব ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র উপস্থিতি তৈরি করেছেন অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা। সম্প্রতি ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ সিনেমা নিয়ে অংশ নিয়েছেন মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। এর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও আলোচনায় ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব, ফ্যাশনভাবনা, শিল্পচর্চা, লেখালেখি এবং ঈদ পরিকল্পনা নিয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্বরলিপি।
রাইজিংবিডি: ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ সিনেমা দিয়ে মস্কোতে এবার বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছেন। এই অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
আশনা হাবিব ভাবনা: আমার সিনেমা এবার মস্কোতে প্রিমিয়ার হয়েছে। কম্পিটিশন বিভাগে ছিল, আর্টকোর বিভাগেও ছিল—আমি সেখানে অভিনয় করেছি। মস্কোর সঙ্গে আমার একটা ভালো সম্পর্ক আছে। সালভি, যাকে আমি আমার গুরু মানি, সে সেই শহরে বড় হয়েছে। তার শহরে অভিনয়ের কাজ নিয়ে যেতে পারাটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, আমি যেন স্টানিস্লাভ সাদালস্কিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। তাই আবেগটা অন্যরকম ছিল। শুধু আমার সিনেমা গিয়েছে, তা-ই নয়—স্টানিস্লাভ সাদালস্কির শহরে আমি সিনেমা নিয়ে এসেছি, অভিনয় নিয়ে এসেছি। মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্টেজে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল, তখন আমি স্টানিস্লাভ সাদালস্কিকে স্মরণ করেছি। সেখানে উপস্থিত সবাই আমাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করেছে।
রাইজিংবিডি: কানে অংশ নিয়েছিলেন এবং আমরা দেখেছি ভারতীয় মিডিয়ায় আপনার ফ্যাশন ও পোশাক বলিউড তারকাদের চেয়েও এগিয়ে রাখা হয়েছে। আপনার ফ্যাশনভাবনা সম্পর্কে জানতে চাই।
আশনা হাবিব ভাবনা: হ্যাঁ, ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ এ নিয়ে হেডলাইনও করেছিল। অবশ্যই এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। কারণ, আমি টাইমস অব ইন্ডিয়ার কাউকে চিনি না। যেহেতু ভারতে আগে কখনও কাজ করিনি, তাই তাদের সঙ্গে কোনো সখ্যও ছিল না। রেড কার্পেটে দেখেই তারা আমার ছবি তুলেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকেরা ফেস্টিভ্যালে আমার ছবি তুলেছেন। অফিসিয়াল রেড কার্পেটে আমি যখন আমার মায়ের বিয়ের শাড়ি পরে হেঁটেছি, সেটা প্রজেক্টরে লাইভ দেখানো হয়েছে এবং কানে অনেক প্রশংসাও পেয়েছি। ফ্রেঞ্চ টিভিতেও দেখানো হয়েছিল।
সেখান থেকেই টাইমস অব ইন্ডিয়া আমাকে খুঁজে বের করে। আমি বাংলাদেশের একজন অভিনেত্রী—এই পরিচয় নিয়েই তারা আমার ফ্যাশন সেন্সের প্রশংসা করেছে এবং তাদের অভিনেত্রীদের চেয়েও এগিয়ে রেখেছে। যেহেতু আমি দেশীয় ফ্যাশনকে তুলে ধরেছিলাম, তাই এই স্বীকৃতিটা অবশ্যই ভালো লেগেছে।
রাইজিংবিডি: মুক্তির অপেক্ষায় থাকা আপনার কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।
আশনা হাবিব ভাবনা: মুক্তির অপেক্ষায় থাকা কাজ নিয়ে বলার এখতিয়ার আমার নেই। কারণ আমি একজন অভিনেত্রী, আমার কাজ অভিনয় করা। এরপর সেটা কবে মুক্তি পাবে, সেখানে আমার কোনো হাত থাকে না। কাজগুলো কবে রিলিজ হবে, সেটা প্রযোজক বা পরিচালকই ভালো বলতে পারবেন।
রাইজিংবিডি: আপনি একজন ঔপন্যাসিকও। অভিনয়, নৃত্য—এসবের পাশাপাশি লেখালেখি কীভাবে এগিয়ে নেন? এখন কী লিখছেন?
আশনা হাবিব ভাবনা: আমি যেটা বলতে চাই, তা হলো—সবকিছু ছাপিয়ে আমি একজন শিল্পী হওয়ার পথেই ছিলাম, আছি এবং থাকতে চাই। শিল্পই আমাকে বেঁধে রাখে। আমি আসলে মানুষের সঙ্গ খুব একটা পছন্দ করি না, শিল্পের সঙ্গ পছন্দ করি। শিল্পই আমাকে আনন্দ দেয়, বাঁচিয়ে রাখে। এই শিল্পটা কখনও অভিনয়, কখনও নাচ, কখনও লেখালেখি, আবার কখনও ছবি আঁকা হয়ে আসে। শিল্প ছাড়া কিছুই আমাকে ধরে রাখতে পারে না। তাই বারবার শিল্পের কাছেই ফিরে যাই, এবং যাব।
লেখালেখিও আমাকে অনেক কিছু লিখতে বাধ্য করে। কিন্তু চাইলেই সব লেখা যায় না। যেহেতু সবাই আমাকে সেলিব্রিটি বলে, তাই আমার যে কোনো কিছুই নিউজ হয়ে যায়, ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়। ফলে সবসময় নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারি না। অতীতে মতামত দিয়ে বুলিংয়ের চেয়েও খারাপ কিছুর শিকার হয়েছি। তাই এখন আমার মতামতগুলো জায়গা পায় পেইন্টিংয়ে, উপন্যাসে, কখনও কবিতায়। কবিতা নিয়মিত লিখি, যদিও ফেসবুকে দেই না। কবিতার বই প্রকাশের ইচ্ছা আছে। খুব দ্রুতই হয়তো পাঠক পড়তে পারবেন।
রাইজিংবিডি: ঈদের আনন্দ কতটা বদলেছে?
আশনা হাবিব ভাবনা: ঈদের আনন্দ অবশ্যই বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, বড় হয়; তখন আনন্দের ধরনও বদলে যায়। আমার মনে হয়, আনন্দ যত বড় হয়, আমরা তত অনুভূতি থেকে দূরে সরে যাই। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতিগুলোও লুকিয়ে ফেলি। ছোটবেলায় সব কিছু অস্বচ্ছ ছিল, তাই আনন্দটাও ছিল খুব সরল আর দারুণ। কিন্তু পৃথিবী যখন ধীরে ধীরে খুব স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, তখন আনন্দটাও আর গভীরভাবে উদযাপন করা যায় না।
রাইজিংবিডি: এবার ঈদের ছুটিতে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার ইচ্ছা আছে?
আশনা হাবিব ভাবনা: ঈদের সময় তো অনেক সিনেমাই মুক্তি পায়। তবে এ সময় আমি চেষ্টা করি বন্ধু-স্বজনদের সময় দিতে। সারাবছর কাজের কারণে অনেকের সঙ্গে দেখা হয় না। আমি যেহেতু সিনেমার মানুষ, তাই খুব ঘটা করে সিনেমা দেখতে যাওয়া হয় না। এই সময়টা পরিবার আর বন্ধুদের নিয়েই কাটে। ঈদের সাত দিন পরে বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা দেখতে যাব। তারা যে সিনেমাটা আগে দেখতে চাইবে, সেটাই আগে দেখব।
রাইজিংবিডি: ঈদে ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। ফাঁকা ঢাকা কেমন লাগে?
আশনা হাবিব ভাবনা: এখন আর ঈদে ঢাকা পুরোপুরি ফাঁকা হয় না। বিকেলের পর থেকেই আবার জ্যাম লেগে যায়। আমার মিডিয়ার খুব বেশি বন্ধু নেই, বা সে রকম মেলামেশাও করি না। আমার বন্ধুরা কেউ চাকরি করে, কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ঈদের সময় সবাই একটু ফ্রি থাকে। তখন সবাইকে ফোন করি, দেখা করি। রাস্তা যতটুকু ফাঁকা থাকে, সেই সময় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, ডিনার করা, কারও বাসায় যাওয়া—এসব খুব ভালো লাগে।