পুরো পৃথিবী থমকে আছে করোনা মহামারিতে। বাংলাদেশে এর প্রভাবে গত মার্চ মাস থেকে কয়েক মাসের জন্য বন্ধ ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, বরং কিছুটা বাড়ছেও।
এসময় অনেকেই ঘরে বসে অলস সময় পার করছেন, আবার কেউবা সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্জন করছে বিভিন্ন দক্ষতা। কিন্তু থেমে নেই উদ্যোক্তাদের জীবন ও জীবিকা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। এমনই একজন তরুণ উদ্যোক্তা দেলোয়ার হোসেন।
দেলোয়ারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লায়। মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই কুমিল্লার সুপ্রতিষ্ঠিত ঔষধ কোম্পানিতে মার্কেটিং বিভাগে চাকরি পেয়ে শেরপুর হয় কর্মস্থান। ২০১৪ সাল থেকে শেরপুরে বসবাস। চাকরিতে থাকা অবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে স্নাতক পর্ব শুরু করেন। এরপর জেলার দেশীয় পণ্য ‘তুলশীমালা চাল’ নিয়ে জেলা ওয়েবসাইট আওয়ার শেরপুরের মাধ্যমে শুরু করেন ই-কমার্স উদ্যোগ। রাইজিংবিডি উদ্যোক্তা ডেস্কের সাক্ষাৎকারে ওঠে এসেছে তার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প।
রাইজিংবিডি: চাকরি না করে উদ্যোক্তা হলেন কেন?
দেলোয়ার হোসেন: স্বপ্ন ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সাফল্যের সঙ্গে চার বছর চাকরি করে কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ হয়নি। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম উদ্যোক্তা হয়ে কঠোর পরিশ্রম করবো। প্রযুক্তির উজ্জ্বল সম্ভবনা বুঝতে পেরে ২০১৮ সালে ই-কমার্স ওয়েবসাইট (www.oursherpur.com) তৈরি ও পণ্য খোঁজ করেছি। ই-কমার্স নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ই-ক্যাব প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদ স্যারের সঙ্গে পরিচয়। স্যারের পরামর্শে সাইটটি বন্ধ করে ২০১৯ সালে জেলাকেন্দ্রীক ওয়েবসাইট বানিয়েছি, পরে পণ্য বিক্রি শুরু করেছি।
রাইজিংবিডি: কি কি পণ্য নিয়ে কাজ করছেন?
দেলোয়ার হোসেন: প্রথমে জেলা ওয়েবসাইটে শেরপুরের স্থায়ী তথ্য আপলোড করেছি। চলতি বছরের শুরুতে ই-কমার্স ফিচার যুক্ত করে জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য ‘তুলশীমালা’ চাল নিয়ে কাজ শুরু করেছি, এর ৭ মাস পর যুক্ত করেছি শেরপুরে উৎপাদিত মণ্ডা (মিষ্টি জাতীয় খাবার)।
রাইজিংবিডি: কোন ভাবনা থেকে কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ করছেন?
দেলোয়ার হোসেন: জেলা ব্র্যান্ডিং ও ই-কমার্সের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যগুলো সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে ই-ক্যাব প্রতিষ্ঠাতা রাজিব আহমেদ স্যার মূলত জেলা ওয়েবসাইটের ধারণাটি দিয়েছেন। স্যারের পরামর্শে ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ‘জেলা ব্র্যান্ডিং পণ্য’ তুলশীমালা চাল নির্বাচন করেছি। কৃষিপণ্যগুলো ই-কমার্সে নিয়ে আসতে পারলে এর সুফল কৃষক ও গ্রাহকরা পাবে। স্টার্টআপ হিসেবে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে কৃষিতে। তাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি কৃষি।
রাইজিংবিডি: ব্যবসার শুরুটা কি অনলাইন কেন্দ্রিক, নাকি অন্য কোনো উপায়ে ছিল?
দেলোয়ার হোসেন: ‘আওয়ার শেরপুর’ যেহেতু স্টার্টআপ, তাই অনলাইন কেন্দ্রিক সবকিছু। আমরা অনলাইন ও অনলাইনের সমন্বয়ে সব কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কারণ আমাদের ইউজাররা (ব্যবহারকারী) এখনো পুরোপুরি অনলাইন নির্ভর হতে পারেনি ও দেশের পুরো সিস্টেম এখনো সরাসরি অনলাইন নির্ভর হয়নি। তবে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ধাপে ধাপে সবকিছু অনলাইন কেন্দ্রিক করা।
রাইজিংবিডি: ব্যবসার শুরুতে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?
দেলোয়ার হোসেন: চাকরি ছেড়ে পুরোদমে নিজের উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করায় বন্ধ হয়ে যায় অর্থ সাপোর্ট। প্রতিবেশীরা বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে। তাছাড়া সব ‘আড্ডা ওয়ার্কশপ’ রাজধানী কেন্দ্রিক হওয়ায় শেরপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করতে হতো নিয়মিত। কৃষিপণ্য নিয়ে ই-কমার্সে কাজ শুরু করায় হোম ডেলিভারি দেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠছিল।
রাইজিংবিডি: বেকার সমস্যা নিরসনে আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কী?
দেলোয়ার হোসেন: এ সমস্যা সমাধানে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাকরি ও ব্যবসার জন্যে স্কিলস ডেভেলপ করতে হবে। দক্ষতা ছাড়া ভালো ক্যারিয়ার প্রায় অসম্ভব। ভবিষতে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে আসবে।
রাইজিংবিডি: আপনার উদ্যোক্তা জীবনে সফল হতে কাদের ভূমিকা বেশি ছিল?
দেলোয়ার হোসেন: আমার উদ্যোগের আইডিয়া থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে রাজিব আহমেদ স্যারের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। তাছাড়াও উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম, কাস্টমার, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সরকারি সাপোর্ট ছিল যথেষ্ট। এখনো প্রতিনিয়ত তাদের সাপোর্ট পাচ্ছি ও এগিয়ে যাচ্ছি।
রাইজিংবিডি: উদ্যোক্তা হতে আপনার ওয়েবসাইটটি কতটা সহায়তা করেছে?
দেলোয়ার হোসেন: ইউজার ও কাস্টমারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম ওয়েবসাইট। আমার ওয়েবসাইট ‘আওয়ার শেরপুর’ আমার উদ্যোগের পরিচয় ও সম্পদ। অনলাইন উদ্যোগে মোটামুটি বাধ্যতামূলকই বলা যায় একটি ওয়েবসাইট। বিশ্বের যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় দ্রুত সার্ভিস প্রদানে, ফান্ড সংগ্রহে ও ডাটা সংরক্ষণসহ সবকিছুতেই প্রয়োজন ওয়েবসাইট।
রাইজিংবিডি: আপনার ব্যবসা নিয়ে পরিকল্পনা কী?
দেলোয়ার হোসেন: জেলা ওয়েবসাইটের প্রতিশব্দ হবে আওয়ার শেরপুর। জেলার সব পণ্য ও সেবার খোঁজ পাবে এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে ব্লগের পর যুক্ত করেছি ই-কমার্স। তারপর যুক্ত হবে ই-ট্যুরিজম। বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে শেরপুরের সব দর্শনীয় স্থান দেখার সুযোগ পাবে আওয়ার শেরপুরে। ধাপে ধাপে জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে আমার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি।
রাইজিংবিডি: উদ্যোক্তা জীবনে কতদিন, আয় কেমন ও আপনার প্রতিষ্ঠানে কর্মী কতজন?
দেলোয়ার হোসেন: প্রায় দুই বছর হতে চললো উদ্যোক্তা জীবন। প্রতিমাসে বিক্রি হয় লাখ টাকার বেশি। বর্তমানে একজন ফুল টাইম ও একজন পার্টটাইম কাজ করছে আমার অধীনে। প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক লিঙ্ক- www.facebook.com/oursherpur
রাইজিংবিডি: রাইজিংবিডির পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
দেলোয়ার হোসেন: আমাকে ও আমার প্রতিষ্ঠানকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য রাইজিংবিডি পরিবারকেও ধন্যবাদ।
ঢাকা/মাহি