ফাগুনের মলাট

‘লেখকই পাঠক, পাঠকই লেখক’

আরিফ সাওন ও আবু বকর ইয়ামিন : গ্রন্থমেলার ১৫ দিন হলেও এখনো জমে ওঠেনি লিটলম্যাগ চত্ত্বর। এখানে বিক্রিও কম। অলস সময় পার করছেন এখানকার স্টলের বিক্রেতারা। এই চত্বরে মাঝে মাঝে আসেন নতুন নতুন বইয়ের লেখকরা। তারাই স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু সময় বিভিন্ন বই পড়েন। খোঁজ-খবর নেন নিজের লেখা বইটির পাঠকপ্রিয়তা নিয়ে। কেউ কেউ বলেন, লিটল ম্যাগাজিনের ‘লেখকই পাঠক, পাঠকই লেখক।’ প্রতি বছরই গ্রন্থমেলায় লিটল ম্যাগাজিনের জন্য ছেড়ে দেয়া হয় বহেড়াতলা। এই লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে এবারও রয়েছে বেশ কিছু প্রকাশনা। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন তাদের নামেই স্টল নিয়ে অংশ নিয়েছেন মেলায়। বসেছে লিটলম্যাগ কর্নার। ছোট কাগজে বড় স্বপ্ন আঁকিয়েদের প্রাণকেন্দ্র এটি। এ বছর লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে স্টলের সংখ্যা ১১০টি।  এরমধ্যে করাতকল, প্রান্ত ৫০, চারবাক, পাতাদের সংসার, চিবিমা, চালচিত্র, গল্পকার, সরলরেখা, মানুষ, স্বপ্ন ’৭১, কবি, অর্বাক, হাতেখড়ি, চিহ্ন, গল্পকথা, তুষারধারা, সাম্প্রতিক, জেব্রাক্রসিং, শিড়দাড়া, দাঁড়কাক, কবিতাচর্চা, একবিংশ, খড়িমাটি, রোদ্দুর, জমিন, দাড়িকমা, লোক, কবিতাবাংলা, ঘাসফুল, শব্দীয়, প্রান্তস্বর, শব্দগুচ্ছ, মেলবন্ধন, ঘুরঘুর, শঙ্খচিল, চিরকুট, মেঘফুল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। লিটলম্যাগ চত্ত্বরের চিত্রই ভিন্ন। শুধু স্টল বিন্যাসে নয়, এখানে যারা দাঁড়িয়ে আড্ডা দেন তাদের আচরণে, কথায়, ভাবনায় এবং স্বপ্নে সবকিছুতেই ভিন্নতা। নিজেদের লেখা ও ভাবনা নিয়ে সবাই মশগুল। কে কি লিখছে, কেমন লিখেছে সবকিছু নিয়ে তুমুল আলোচনা জমে ওঠে বিকেল থেকে। তাদের সবার চোখে নতুন কিছু করার স্বপ্ন। বাংলা সাহিত্যের নতুন বাঁক তো এই তরুণ লেখকদের হাত দিয়েই ঘটবে আগামীতে! লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও বাংলাদেশে এর বিস্তার ঘটে ষাটের দশকে। গতানুগতিক প্রথার বিপরীতে গিয়ে এক ধরনের সাহিত্যচর্চা বা সাহিত্য আন্দোলনের নামই লিটল ম্যাগাজিন। ব্যক্তিগত কিংবা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র চিন্তাধারাকে প্রকাশের ইচ্ছা থেকেই লিটল ম্যাগাজিনের জন্ম। নতুন লেখকরা নিজেদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখে নিজেরাই প্রকাশক হিসেবে ভূমিকা রাখতেন। নতুনদের এ লেখা পাঠক সমাজেও সুনাম কুড়ায়। বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় লেখক উঠে এসেছে এই লিটল ম্যাগাজিনে সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে। শুধু পাঠক নয়, স্পন্সরের অভাবেই এর প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন প্রকাশকরাও। পকেটের টাকা দিয়ে এটি বেশিদিন চালানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন প্রকাশকরা। ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সহকারী সম্পাদক রাশেদ রিন্টু জানান, গত ৪-৫ দিনে ২০টি সংখ্যা বিক্রি করেছেন তিনি। বেহুলা বাংলা- এর বিক্রয়কর্মী সিরাজ আরিফ বলেন, ‘বেচাকেনা তেমন একটা হচ্ছে না। ৪-৫টি করে বিক্রি হচ্ছে। এখানে পাঠকদের আনাগোনাও কম।’ কবিতা চর্চার প্রকাশক বদরুল হায়দার বলেন, ‘আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলা যাবে না, লিটলম্যাগ জমেই ১৫ তারিখের পর। সারাদেশ থেকে কবি সাহিত্যিকরা আসবেন আর এখান থেকে কিনবেন। মূলত এর লেখকরাই পাঠক।’ তিনি মনে করেন, লিটলম্যাগই হচ্ছে একজন লেখককে লেখক করে গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম। এর প্রতি অনাগ্রহ প্রকৃত লেখক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়ক হয় না। মেঘফুল- এর প্রকাশক নীল সাধু বলেন, ‘এখানে যারা আসার তারা আসেন। সাহিত্য পত্রিকার সাথে সম্পৃক্তরা সবাই আসছেন।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রায়হানুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন কবি সাহিত্যিকদের লেখা কবিতা, গল্প ও উপন্যাস আমরা পড়ি। তবে সেগুলো মানসম্মত হতে হবে। লিটলম্যাগের এ জায়গায় একটু পিছিয়ে বলে পাঠকরা এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর প্রকাশনাও তো বাড়ছে, তরুণরা চাইলে যেকোনো প্রকাশনা থেকে বই বের করতে পারছেন। তাই তারা লিটলম্যাগের দিকে আসেন না।’ রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/সাওন/ইয়ামিন/শাহনেওয়াজ