সাতসতেরো

ঈশা খাঁ ও ইলা মিত্রের জন্মদিন আজ

শাহ মতিন টিপু : ঈশা খাঁ ও ইলা মিত্রর দুজনের জীবনেই জড়িয়ে আছে নানা বীরত্বের কাহিনী। আর সেই বীরত্ব গাঁথার জন্য দুজনই ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। দুজনকেই পরম সম্মানের সঙ্গে আজও স্মরণ করে বাংলার মানুষ।

 

বাংলার বার ভুইয়ার ইতিহাস কে না জানে। ঈশা খাঁ ছিলেন বাংলার বার ভুইয়ার প্রধান। ঈশা খাঁ সহ বার জন জমিদার একসাথে বাংলায় স্বাধীনভাবে জমিদারী স্থাপন করে। ঈশা খাঁর বাংলো বাড়ি ছিল কিশোরগঞ্জে।

 

তার পিতা সোলায়মান খান বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহের রাজত্বকালে (১৫১৯-১৫৩৩ খ্রি.) পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। নিজ দক্ষতায় তিনি ভাটি অঞ্চলে বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলার উত্তর-পূর্ব অংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ঈশা খাঁর ১৯ বছর বয়সেই তার পিতা এক যুদ্ধে প্রাণ হারান । ঈশা খাঁর শৈশব ও যৌবন ভাটি অঞ্চলেই কাটে। ৩৫ বছর বয়সে ঈশা খাঁ বাংলার করবানী শাসকদের ‘সামন্ত’ হিসেবে সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদী পরগনায় (১৫৬৪ খ্রি.) জমিদারী লাভ করেন। এরপর ঈশা খাঁ করবানী শাসকদের আরো অনুগ্রহ লাভ করে ক্রমশঃ শক্তি ও পদমর্যাদা বৃদ্ধি করেন।

 

১৫৭১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি এত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন যে, মুঘল ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাকে পূর্ব বাংলার (ভাটি অঞ্চলের) শাসকরূপে আখ্যায়িত করেন।

 

ঈশা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা উদয় মানিক্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম অভিযানে (১৫৭৩ খ্রি.) দাউদ খানকে সাহায্য করেছিলেন। তারপর (১৫৭৫ খ্রি.) সোনারগাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মুঘল নৌবহরকে বিতাড়িত করতে দাউদ খানের সেনাপতিকে ঈশা খাঁ সাহায্য করেছিলেন। ঈশা খাঁর দক্ষতা ও কর্তব্যনিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে দাউদ খান তাঁকে ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

 

ঈশা খাঁর অমর স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে কিশোরগঞ্জ জেলার ‘জঙ্গলবাড়ী’ আর ‘এগারসিন্দুর’ নামক দু’টি সুপ্রাচীন জনপদ। কিশোরগঞ্জ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) শহরের চেয়েও অধিক প্রাচীন এ জঙ্গলবাড়ী জনপদ। বাংলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ বার ভূঁইয়াদের অন্যতম মর্জুমানে ভাটি ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী ছিল এই জঙ্গলবাড়ী।

 

জানা যায়, লাল মাটি, সবুজ গাছগাছালি আর ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এগারসিন্দুর। এটি ছিল ঈশা খাঁর শক্ত ঘাঁটি। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে এগারসিন্দুর। জনশ্রুতি আছে, বেবুধ নামে এক কোচ উপজাতি প্রধান ষোড়শ শতাব্দীতে এগারসিন্দুর দুর্গ নির্মাণ করেন। ঈশা খাঁ বেবুধ রাজার কাছ থেকে দুর্গটি দখল করেন এবং একে শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করেন। ১৫৯৮ সালে মান সিংহ দুর্গটি আক্রমণ করেন।

 

এই এগার সিন্দুরেই ঈশা খাঁ ও মানসিংহের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। মসনদ-ই আলা ঈশা খাঁ ও মুঘল সেনাপতি রাজা মানসিংহের মধ্যে দ্বৈত যুদ্ধের কাহিনী আজও মানুষের মুখে মুখে। ওই যুদ্ধে এক পর্যায়ে মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেলে ঈশা খাঁ তাকে হত্যা না করে আরেকটি তরবারি তার হাতে দিয়ে পুনরায় যুদ্ধের আহ্বান জানান। ঈশা খাঁর এই মহত্বে মুগ্ধ হয়ে সেনাপতি রাজা মানসিংহ তাকে বন্ধু হিসেবে আলিঙ্গন করেন।

 

১৫৩৭ সালের ১৮ অক্টোবর ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণায় ঈশা খাঁর জন্ম। দাম্পত্য জীবনে প্রথমে স্ত্রী সৈয়দা ফাতেমা খাতুন ও দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম স্বর্ণময়ী। সন্তানদের মধ্যে মুসা খাঁ ও মোহম্মদ খাঁ। ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার মৃত্যু হয়। 

ইলা মিত্রইলা মিত্র জমিদারের পুত্রবধূ হয়েও জমিদার ও জোতদারদের শোষণ আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্বার আন্দোলন। তার এ সংগ্রামে এক হয়ে গিয়েছিল বাঙালি ও আদিবাসী সাঁওতাল।

 

১৮ অক্টোবর নাচোলের সাঁওতাল বিদ্রোহের মহানায়িকা ইলা মিত্রের ৯০তম জন্মদিন। ইলা মিত্রের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল। লেখাপড়া করেছেন কলকাতার বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজে।

 

কৈশোরে খেলাধুলায় তিনি ছিলেন অসম্ভব তুখোড়। ১৯৩৫ থেকে `৩৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়নের তকমাটা ঝুলেছে তার গলায়। তিনিই প্রথম বাঙালি মেয়ে, যিনি ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক বাতিল হয়ে গেলে তার আর এ ক্রীড়াযজ্ঞে অংশ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। গত ১৩ অক্টোবর ছিল তার মৃত্যুদিবস (২০০২)।

 

চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে ফসলের `তেভাগা` প্রতিষ্ঠার দাবিতে ইলা মিত্র হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি! কৃষকরা গায়ে-গতরে খেটে ফসল ফলায়, সব খরচ জোগায়। তারাই ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ ভাগ পাবে। এই দাবিতে গড়ে উঠেছিল তেভাগা আন্দোলন। রাজশাহী জেলার, বিশেষ করে নাচোলের কৃষকদের এই আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ইলা মিত্রের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

 

স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আদিবাসী-বাঙালি সবার মন জয় করে নেন। ক্রমশ হয়ে ওঠেন সাঁওতাল ও অন্যান্য কৃষকদের `রানীমা`। কৃষকদের সঙ্গে সংঘর্ষে দারোগাসহ চারজন পুলিশ নিহত হলে পাকিস্তানি শাসকরা আদিবাসীদের ওপর প্রচন্ড নিপীড়ন চালাতে শুরু করে। ভেঙে পড়ে নাচোলের প্রতিরোধ আন্দোলন। চরম লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় ইলা মিত্রকে। তাকে ১ নম্বর আসামি করে মোট ৩১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রুজু করা হয়। বিচারে ইলা মিত্রসহ ২৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। ইলা মিত্র রাজশাহী ও ঢাকা জেলে বন্দি ছিলেন ১৯৫০-৫৪ সাল পর্যন্ত।

 

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় গেলে চিকিৎসার প্রয়োজনে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে কলকাতা চলে যান ইলা মিত্র। আর পূর্ববাংলায় ফিরে আসেননি। এরই ফাঁকে এমএ পাস করে কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। ১৯৬২-৭৮ সময়ের মধ্যে মানিকতলা নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি পরপর চারবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে আবার দু`বার ছিলেন বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি লিডার। রাজনৈতিক কারণে পশ্চিম বাংলাতেও তাকে চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

 

১৯৪৫ সালে ইলা সেনের বিয়ে হয় মালদহের জমিদারপুত্র ও কমিউনিস্ট নেতা রমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে। সংগ্রামী এই নারীকে নিয়ে আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ‘নাচোলের রানী’। ইলা মিত্রের সংগ্রামী জীবন মানুষের কাছে আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

     

রাইজিংবিডি/ঢাকা/ ১৮ অক্টোবর ২০১৫/ টিপু