সাতসতেরো

শোনা যায় না ডাহুকের ডাক

মো. আনোয়ার হোসেন শাহীন, মাগুরা : ‘গুলে বকৌলির নীল আকাশ মহল হয়ে আসে নিসাড় নিঝুম। নিভে যায় কামনা-চেরাগ অবিশ্রান্ত ওঠে শুধু ডাহুকের ডাক। কোন ডুবুরির অশরীরী যেন কোন প্রচ্ছন্ন পাখির সামগ্রিক অতলতা হতে মৃত্যু-সুগভীর ডাক উঠে আসে।’

(ডাহুক, ফররুখ আহমেদ)

 

শুধু তিনি নন বিদ্যাপতি, জীবনানন্দ, চন্ডিদাস ও আল মাহমুদসহ অনেক কবির কাব্যের অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার পাখি ডাহুক। ডাহুক-ডাহুকীর ডাকে মনের নানা অভিব্যক্তি ভেসে উঠেছে নানা কবিতায়। ডাহুক নিয়ে আল মাহমুদ  শেষবারের মতো খুঁজে ফিরেছেন তার স্মৃতি :

‘স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?’

 

কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন : ‘মালঞ্চে পুষ্পিতা লতা অবনতমুখী,- নিদাঘের রৌদ্রতাপে একা সে ডাহুকী বজন-তরুর শাখে ডাকে ধীরে ধীরে বনচ্ছায়া-অন্তরালে তরল তিমিরে।’

 

ডাহুক এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। ডাহুক জলের পাখি। খুব ভীরু। জলাভূমির আশপাশের ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে থাকা এই পাখিটি মাঝারি আকৃতির। লেজ ছোট। পা লম্বা। পায়ের আঙুলও বেশ লম্বা। পিঠের রং ধূসর থেকে খয়েরি-কালো, মাথা ও বুক সাদা। লেজের নিচের অংশে লালচে আভা। ঠোঁট হলুদ রঙের, ঠোঁটের উপরে লাল রঙের একটি ছোট্ট দাগ আছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, বাচ্চাদের রং হয় সবসময় কালো।

 

উদ্ভিদের ডগা এদের প্রিয় খাবার, এছাড়া জলজ পোকা-মাকড়, শ্যাওলা খায়। ডাহুক বাসা তৈরি করে মাটিতে, ঝোঁপের তলায়। জলজ উদ্ভিদের বীজ, কচুরিপানা ও কলমি ঝোপে পানির ওপর এরা খড়কুটো এবং শুকনো শ্যাওলা ও জলজ উদ্ভিদ দিয়ে গোলাকার পরিপাটি বাসা বানায়। পানি এদের প্রধান আশ্রয়। পুকুর, খাল, জলাভূমি, বিল, নদীর গোপন লুকানো জায়গা এদের খুব প্রিয়। পায়ের নখগুলো লম্বা লম্বা, ফলে পদ্ম ও শাপলা পাতায় দিব্যি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং কচুরিপানার ওপর ছোটাছুটি করতে পারে।

 

ডাহুকের প্রজনন কাল (জুন-সেপ্টেম্বর) আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। এ সময় তাদের মৃত্যুর হারও বেশি। ডিম পাড়ে ৬-৭টি। ডিমের রং ফিকে হলুদ বা গোলাপি মেশানো সাদা। ডিমে তা দেয় স্ত্রী-পুরুষ উভয় মিলে। বনে-বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়ানো ডাহুক-ডাহুকীর স্বার্থহীন ভালোবাসার গল্প প্রচলিত আছে। শুনলে অবাক হতে হয়। যখন সঙ্গীর খোঁজ না পায়, দিনরাত ডাকতে ডাকতে গলা চিড়ে রক্ত উঠে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে মৃত্যুর কোলে। ডাহুক নিয়ে এমন কথাও শোনা যায়!

 

রাতে ডাহুকের ‘কোয়াক’ ‘কোয়াক’ ডাক শুনে সহজেই চেনা যায়। এই ডাক পুরুষ পাখির, যা বর্ষাকালে বেশি শোনা যায়। একটানা অনেকক্ষণ ডেকে এরা শ্বাস নেয়। কিন্তু মায়াবী এই পাখিটি চোরা শিকারি আর বাসস্থানের অভাবে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জলাভূমির অতিচেনা নীল ডাহুক পাখিটিও হারিয়ে যাচ্ছে। আগে মাগুরা জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের ঝোঁপঝাড়, জলাশয় এবং কচুরিপানা সমৃদ্ধ পুকুরে এদের দেখতে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন বড় বড় বিল হাওর ছাড়া এদের দেখতে পাওয়া যায় না। ডাহুক একটি বিপন্ন পাখি।

 

মাগুরার বিশিষ্ট সাংবাদিক শামীম খান জানান, ‘দশ বছর আগেও গ্রামে-গঞ্জে প্রচুর ডাহুক পাখির ডাক শোনা যেত। ডাহুকের ডাক সর্বশেষ কবে শুনেছি মনে পড়ে না। ঝোঁপ-জঙ্গল ও জলাভূমি কমে যাওয়ায় দিনদিন বিপন্ন হচ্ছে ডাহুকসহ পাখির আবাসভূমি। এছাড়া পোষা ডাহুক দিয়ে ফাঁদ পেতে এক শ্রেণির শিকারি ডাহুক ধরায় সুন্দর এই পাখিটি এখন আর দেখা যায় না বললেই চলে।

   

রাইজিংবিডি/মাগুরা/২১ অক্টোবর ২০১৬/আনোয়ার হোসেন শাহীন/মুশফিক