সাতসতেরো

যেভাবে খুঁজে পেলাম ‘কালো বাজ’ পাখি

যাচ্ছিলাম হবিগঞ্জ জেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। পথিমধ্যে সুরমা চা বাগানের একটি গাছের ডালে একটি পাখি দেখতে পেলাম। সিএনজি অটোরিকশা থামিয়ে ক্যামেরা বের করার আগেই পাখিটি উড়ে গেল। বাগানের ভেতর অনেক খোঁজার পরেও আর দেখা পেলাম না। সময়টি ছিল ২০১৭ সালের মার্চ মাস। তারপর যত বার ও-পথে গিয়েছি পাখিটির খোঁজ করেছি; দেখা পাইনি।

২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আমার গাইড প্রসেনজিত দেববর্মা ফোনে জানাল পাখিটি দেখা গেছে। পরদিনই সাতছড়ি চলে গেলাম। আমরা ৩ ঘণ্টার ট্রেইল ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় ভারত সীমান্তে পৌঁছে যাই। পথের দুই পাশে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাখিটির দেখা পেলাম না। সন্ধ্যায় বন বিভাগের ডরমেটোরিতে ফিরে এলাম ব্যর্থ হয়ে। 

পরদিন ভোরে আমরা দুজন পাখিটির খোঁজে আবারও বের হলাম। সেদিনও পাখিটির দেখা মিললো না। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে যা হয়। সন্ধ্যায় মন খারাপ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। চলতি বছর জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে পুনরায় সাতছড়ি যাই। বন বিভাগের টাওয়ারসংলগ্ন ফটোগ্রাফারদের অতি পরিচিত মান্দার গাছে হরেক প্রজাতির পাখি ফুলের মধু খাচ্ছে। সেদিকে তেমন আগ্রহ নেই। মন পড়ে আছে সেই পাখির উপর। মনে মনে ভাবছিলাম যদি পাখিটিকে টাওয়ারের আশপাশে এক নজর দেখতে পেতাম। সেগুন বাগানের কাছে পাখিটির দেখা পাওয়া যায়- বলেছিলেন হারিস মামা। পাখিটির খোঁজে তার সঙ্গে লেবু বাগান ধরে হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে গেলাম। অথচ সেদিনও দেখা পেলাম না।

এরপর মার্চ মাসের ৭ তারিখ রাজশাহী বার্ড ক্লাবের সভাপতি নাইমুল হাসান ভাই, রাজিব রাব্বানী, বাউল সাজু ভাই ও সৈয়দ আব্বাসসহ সাতছড়ি গেলাম। ভোরের আকাশ ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। মেঘে ঢাকা সূর্যের আলো নেই। টাওয়ারে আমরা সবাই যার যার মতো ছবি তুলছিলাম। এরই মধ্যে সৈয়দ আব্বাস পাখিটির নাম ধরে বললেন- যে যে লাইফার তুলতে চান তুলতে পারেন। আব্বাসের কথা শোনার পর জ্ঞান হারানোর উপক্রম! তখনও পাখিটির দেখা পাইনি। সঙ্গী সাজু ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি দেখিয়ে দিলেন। উত্তেজনা বেড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ লাগিয়ে বেশ কিছু ছবি তুললাম। পাখিটি বেশ দূরে থাকলেও দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হলো।

যে পাখিটির কথা বলছিলাম সেটি Aviceda গোত্রীয় ও Accipitridae পরিবারের ৩৩ সে.মি. দৈর্ঘের খাড়া ঝুঁটি এবং বুকে ডোরাদাগের কালো বাজ পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির কয়েকটি সাদা টান ও ডোরাসহ দেহ কালো। মাথার ঝুঁটি খাড়া ও লম্বা কালো রঙের। কাঁধ-ঢাকনি সাদা ও তামাটে। পিঠ কালো। ডানা গোলাকার। সাদা ও তামাটে ডোরাকাটা বুক। ঠোঁট স্লেট রঙের। চোখ গাঢ় লাল। পা ও পায়ের পাতা হালকা খয়েরি-নীল। ছেলে ও মেয়ের পাখির চেহারায় ভিন্নতা রয়েছে।

কালো বাজ চিরসবুজ বনে বিচরণ করে। চওড়া পাতা বন এদের খুব পছন্দ। যার জন্য বনের সেগুন বাগানে প্রায়ই দেখা যায়। তবে পাহাড়ের পাদদেশের বনেও সচারচর থাকে। এরা একা, জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। এরা গাছের ডালে বসে আহার খোঁজে এবং ছো মেরে শিকার ধরে খায়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে টিকটিকি, ব্যাঙ, ঘাসফড়িং এবং অন্য পোকামাকড়। অনেক সময় বাঁদুড় ও ছোট ছোট পাখিও খায়। এরা ভোর ও পড়ন্ত বেলায় খুব কর্মচঞ্চল থাকে। এদের গলার স্বর কর্কশ। প্রজননকাল এপ্রিল থেকে জুলাই মাস। প্রজননকালে বনের গাছে ৫০ থেকে ৬০ ফুট উঁচুতে ডালপালা দিয়ে মাচার মতো বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়েপাখি ৩-৪টি ডিম দেয়।

কালো বাজ বাংলাদেশে বিরল পরিযায়ী পাখি। তবে এ বছর সাতছড়ি বনে ছানাসহ পাখিটিকে দেখা গেছে। শীতে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের চিরসুবজ বনে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, মিয়ানমার ও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে। কালো বাজ বিশ্বে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়নি।