সাতসতেরো

কোরআনের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

চন্দ্র, সুর্য, গ্রহ তারা, নীল আসমান, গাছপালা, তরুলতা, ফুল-ফল, নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর, পাহাড়, ঝর্ণা আর হাজরো নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী। যার উসিলায় সৃজিত, যিনি সৃষ্টি না হলে আসমান যমিনের কিছুই সৃষ্টি হতো না, তিনিই আমাদের প্রিয়নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।  মহাকালের মানব ইতিহাসে তিনিই সর্বশ্রেষ্ট, সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে পবিত্র।

পড়ুন: আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী

বেলাদত ও জন্মগ্রহণ প্রত্যেক মানুষের জন্যই খুশি ও আনন্দের পরিচায়ক হয়ে থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জন্মদিনের একটি নির্দিষ্ট গুরুত্ব লক্ষ্য করা যায়।  আর এই গুরুত্ব সে সময় আরও বেড়ে যায় যখন সেদিনগুলোর সম্পর্ক আম্বিয়া (আলাইহিমুস্সালাম)-এর সাথে হয়। আম্বিয়ায়ে কেরামের জন্ম আসলেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার শ্রেষ্ঠ ও বৃহত্তম নেয়ামত। প্রত্যেক নবীর জন্ম নেয়ামতের ওসীলায় সংশ্লিষ্ট উম্মতগণ অন্য সব নেয়ামত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করে। হুযুর নবীয়ে আকরাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদকায় উম্মতে মুহাম্মদীর আবির্ভাব ও নব্যুয়তে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমানী হেদায়েতের নিয়ামত, ওহীয়ে রাব্বানীর নেয়ামত নুযুলে কোরআন ও মাহে রমযানের নেয়ামত, জুমা ও ঈদাইনের (দুই ঈদ) নেয়ামত, শরফ ও ফযিলত মূলত: সুন্নাত ও সীরাতে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই নেয়ামত।

মোটকথা, যতসব নেয়ামত ক্রমাগতভাবে দান করা হয়েছে ওই সকল নেয়ামতের মূল প্রতিপাদক এবং রবিউল আউয়ালের মূলকেন্দ্র হচ্ছে আনন্দপূর্ণ ও প্রাণস্পর্শী বসন্তের সমুজ্জ্বল সুবহে সাদেক, যখন হুযুর নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৌভাগ্যময় বেলাদত হয়েছে এবং সেই বরকতপূর্ণ দিন যখন পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পৃথিবীর পানি ও ফুলের পরিবেশে আগমন করেছিলেন। সুতরাং হুযুর নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৌভাগ্যপূর্ণ বেলাদতের উপর খুশি হওয়া ও আনন্দ প্রকাশ করা ঈমানের আলামত এবং স্বীয় পথপ্রদর্শক নবীয়ে মুকাররাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের আয়না বিশেষ।

ঈদ: ‘ঈদ’ মানে খুশি বা আনন্দ প্রকাশ করা। আর ‘মীলাদ’ অর্থ জন্মের সময় বা দিন। ‘নবী’ শব্দ দ্বারা হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুঝানো হয়। ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ বলতে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিলাদত শরীফ-এর দিন উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা, ছানা-ছিফত, ফাযায়িল-ফযীলত, শান-মান বর্ণনা করা, তার প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করা, তার পূত-পবিত্রতম জীবনী মুবারকের সামগ্রিক বিষয়ে আলোচনাকেই বুঝায়। 

আল কোরআনে ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: আল্লাহ্ তা’আলার প্রিয় নবী-রাসূলগণ আলায়হিমুস্ সালাম, সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বাইতে রাসূল ও আউলিয়ায়ে কেরামের শুভ জন্মদিন এবং ওফাত দিনকে কেন্দ্র করে মাহফিল করা, নানা পূণ্য ও কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে তাদের অবদানকে স্মরণ করা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও শরীয়ত সম্মত কাজ।  কেননা এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ তাদের জীবন, কর্ম ও অনুপম আদর্শ সম্পর্কে অবগত হতে পারে এবং নিজের জীবনেও তাদের আদর্শ বাস্তবায়নে আগ্রহী ও উৎসাহিত হয়ে উঠে।

আল্লাহতায়ালা স্বীয় হাবীবে মুকাররাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেলাদতের যিকির মোবারক শপথসহকারে বর্ণনা করেছেন, ইরশাদ হয়েছে: ‘আমি এই শহরের (মক্কা) শপথ করছি, (হে হাবীব!) এজন্য যে এই শহরে আপনি তশরীফ আনয়ন করেছেন। (হে হাবীব!) আপনার পিতার [আদম আলাইহিস সালাম অথবা ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের] শপথ এবং (তাদের) শপথ, যারা জন্মগ্রহণ করেছে।’ (সূরা বালাদ: আয়াত ১-৩)।

মহান আল্লাহ পাক আলমে আরওয়াহতে সমস্ত নবী-রসূলকে (আলাইহিমুস সালাম) নিয়ে ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করেছেন, তথা আগমন শরীফের মহান খুশির খোশ খবরী জানিয়ে দেন এবং তার প্রতি ঈমান আনয়ন ও খিদমত ফরয করে তার ওয়াদা নেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন-‘(হে আমার হাবীব আপনি স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা) যখন আল্লাহ (আলমে আরওয়াহতে) নবীগনের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, আমি যা কিছু তোমাদের দান করেছি কিতাব ও জ্ঞান এবং অতঃপর তোমাদের নিকট কোন রসূল আসেন তোমাদের কিতাবকে সত্য প্রতিপাদনের জন্য, তখন সে রসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তার সাহায্য করবে।  তিনি বললেন, ‘তোমারা কি অঙ্গীকার করছো এবং এই শর্তে আমার ওয়াদা গ্রহণ করে নিয়েছ? তারা বললেন, ‘আমরা অঙ্গীকার করেছি’। তিনি বললেন, তাহলে এবার সাক্ষী থাক। আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম।  অতঃপর যে লোক এই ওয়াদা থেকে ফিরে দাঁড়াবে, সেই হবে নাফরমান। (সূরা আলে ইমরান- ৮১, ৮২) ।

পবিত্র কোরআনে প্রায় অর্ধশতাধিকবার নির্দেশ এসেছে আল্লাহর প্রিয় জনদের স্মরণ করার বিষয়ে, যেমন আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন- (হে হাবীব! স্মরণ করুন কিতাবে হযরত ইবরাহীমকে)। [মারয়াম: (হে হাবীব! স্মরণ করুন কিতাবে হযরত মুসাকে)। [মারয়াম-৫১]।

এ নির্দেশটি শুধু আল্লাহ্ তা’আলার নবী-রাসূলদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয় বরং আউলিয়ায়ে কেরামের ক্ষেত্রেও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেন-(হে হাবীব আপনি কিতাবে হযরত মারয়ামকে স্মরণ করুন)। [মারয়াম:১৬]।

এ আয়াতে হযরত মরিয়াম আলায়হিস্ সালামকে স্মরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কথা কারও অজানা নেই যে, হযরত মরিয়াম আলায়হিস্ সালাম নবী ছিলেন না, বরং তিনি আল্লাহর একজন ওলী ছিলেন।

অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা’আলা ক্বোরআন করিমে তার প্রিয় নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি যেন তার উম্মতদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে নেয়ামত অবতরণের দিনগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেন। আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন-(হে হাবীব! আপনি আপনার উম্মতদেরকে আল্লাহর দিনগুলো সম্পর্কে উপদেশ দিন। [ইবরাহীম-০৫]।

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলার দিনগুলোকে মানে ওসব দিনকে বুঝায় যে দিনগুলোতে আল্লাহ্ তা’আলা তার বিশেষ কোন বান্দা বা বিশেষ কোন যাতকে কোন খাস বা বিশেষ নেয়ামত দ্বারা ধন্য করেছেন। আর এ দিনগুলো হলো শুভ জন্মদিন, বিজয়ের দিন ইত্যাদি।

জন্মদিবস ও ওফাত দিবসকে আল কোরআনের বিশেষ সম্মান:

আল্লাহ্ তা’আলা তার প্রিয়জনদের শুভজন্ম এবং তাদের বেচাল বা ওফাত দিবসকে কোরআনুল করিমে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন এবং এ দিনগুলোকে বিশেষ শান্তি ও সালামের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বরং আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে এ দিনগুলোতে বিশেষ সালাম প্রেরণ করা হয়েছে। হযরত ইয়াহ্য়া আলায়হিস্ সালাম এর শুভজন্ম ও বেচাল শরীফ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেন: ‘এবং তার প্রতি সালাম বা শান্তি যেদিন তিনি (হযরত ইয়াহ্য়া আলাহিস্ সালাম) জন্মগ্রহণ করেছেন। যেদিন তিনি ওফাত পাবেন এবং যেদিন তিনি পুনর্জীবিত হবেন। [সূরা মারয়াম:১৫]।

হযরত ইসা আলায়হিস্ সালামের ভাষায় আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেছেন, হযরত ইসা আলায়হিস্ সালাম তার মাতৃক্রোড়ে এ ঘোষণা দিলেন যে , ‘এবং আমার প্রতি সালাম ও শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি ওফাত পাবো এবং যেদিন আমি পুনর্জীবিত হবো। [মারয়াম:৩৩]।

এ আয়াতদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হলো জন্ম ও ওফাতের দিনকে উপলক্ষ করে দুরূদ, সালাম, দোয়া, মুনাজাত ও নেয়ায-তাবাররুকাতের ব্যবস্থা করা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত বরকত ও ফযিলত মণ্ডিত কাজ।  যদি এতে শরিয়ত বিবর্জিত কোনো কাজ সংঘটিত না হয়।

আল্লাহ্ তা’আলার প্রিয়জনদের স্মরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ্ তা’আলা আরও এরশাদ করেন- (নিশ্চয় তাদের ঘটনাসমূহে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ)। [ইউসুফ:১১১]। (আপনি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিন, কেননা স্মরণের মধ্যে রয়েছে মুমিনগণের জন্য অনেক উপকার। [যারিয়াত:৫৫]।

মহান আল্লাহ্ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ করে বলেন- (আমি আপনার নিকট পূর্ববর্তী রাসূলগণের যা ঘটনা বর্ণনা করেছি তা আমি আপনার হৃদয়কে সুদৃঢ় ও মজবুত করার জন্য। [হুদ: ১২০]।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং খতিব, মুসাফির খানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম