চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন, মনভোলানো কথা আর লোভনীয় প্যাকেজ— দু’তিনটি বড় কোম্পানি ছাড়া প্রায় সব টুরিস্ট অপারেটর ও কোম্পানিগুলো হরহামেশা এমন প্রতারণা করে যাচ্ছে। দেশে-বিদেশে ঘুরানোর নানা প্যাকেজের লোভনীয় প্রস্তাবের পুরোটা-ই যেন একটি ‘গভীর ফাঁদ’। এমন প্রতারণায় ভ্রমণপিপাসুরা হারাচ্ছেন টাকা-পয়সা, হচ্ছেন ভোগান্তির শিকার।
এসব কথিত টুরিস্ট কোম্পানিগুলোর বেশিভাগের-ই নেই অফিস। থাকলেও এক রুমের, নেই সরকারি অনুমোদন। যে যার মত প্যাড-ভিজিটিং কার্ড নিয়ে ট্যুর অপারেটর সেজে আছে। তাদের প্রতারণার প্রধান মাধ্যম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই প্লাটফর্মে বুস্ট করে প্রতারণার লোভনীয় জাল বিছিয়ে থাকে। অফার দেয়— অল্প টাকায় কক্সবাজার, বান্দরবন, অমুক-তমুত দেশ ভ্রমণ। আগেই ৫০ শতাংশ অ্যাডভান্স করুন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্রমণ কনফার্ম। আর টাকা দেওয়ার পরই মোবাইল বন্ধ, এমনকি খুঁজেও পাওয়া যায় না।
আরও ভোগান্তি আছে! প্যাকেজ বুকিংয়ের সময় যে সেবার প্রতিশ্রুতে দেবে, সেটা দেয় না। পরে এমন আচরণ করবে যেন বাধ্য হয়ে তাদের প্যাকেজ আপনি গ্রহণ করেছেন। আর যারা বিদেশ ট্যুর অপারেট করে থাকে, সেখানে আছে বিরাট শুভঙ্করের ফাঁদ। কোম্পানিগুলো স্বল্প বেতনে স্মার্ট ছেলে-মেয়ে দিয়ে এগুলো করিয়ে থাকে। তাদের কাজ হচ্ছে মানুষকে টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা। প্যাকেজ গুছিয়ে দিয়ে কমিশন ভাগিয়ে নেওয়া। কিন্তু প্যাকেজ পরবর্তী কোনোরকম সেবা চুক্তি অনুযায়ী দিচ্ছে না।
আপনার কাছে যখন দেশ মালদ্বীপ, ভুটান, দুবাইয়ের প্যাকেজ বিক্রি করবে তখন বলবে— সেখানকার যেকোনও সমস্যা তারা দেখবে। আশ্বর্যের বিষয়, কোনও সমস্যা হলে তারা সমাধান করবে না। উল্টো আপনাকে চিনবেই না। তাদের ফেসবুক পেজের বিজ্ঞাপনে লেখা থাকবে— এত টাকায় মালদ্বীপ, ব্যাংকক, হংকং, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভুটান ইত্যাদি। কিন্তু যখনই আপনি ফোন দেবেন, শুরু হবে তালবাহানা। বিভিন্ন অজুহাতে (এটি দুজনের নয়, গ্রুপ প্যাকেজ; এক রুমে ৪ জন, দুজন থাকলে এক্সট্রা চার্জ, এখন ভিসা হচ্ছে না, টিকিটের দাম বেশি) তারা সেই প্যাকেজের রেট থেকে সরে আসবে।
আবার ভিসার বিজ্ঞাপন নিয়েও চলছে মহা প্রতারণা। অমুক দেশে (অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা, লন্ডন) ভিসা হচ্ছে। পাসপোর্ট জমা দেন, ট্যুর অপারেট হচ্ছে— এমন সব অফার থাকবে। আপনি গেলে ভিসা ফি ইনভাইটেশন, সার্ভিস চার্জসহ নানানভাবে টাকা নেবে। যে কাগজ তারা দেয়, এগুলো ইচ্ছে করলে আপনি নিজেই করতে পারবেন। তারা আপনার থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে অ্যাম্বাসিতে দাঁড় করাবে। কিন্তু অ্যাম্বাসি পাসপোর্টে ভিসা না দিয়ে ফেরত দেবে। কোনও প্রকার জবাবদিহিতা করার সুযোগ নেই। আর যারা জমা দিচ্ছেন তাদের ১০০ জনের মধ্যে একজনের ভিসা হয়। যার হলো তাকে নিয়ে তারা ভিডিও করিয়ে, তার ছবি দিয়ে নানান চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দেবে।
ট্যুর অপারেটর নিয়েও আছে নানা ধরনের প্রতারণা, ভোগান্তি। আপনি যখন প্যাকেজ নেবেন, বলা হবে এয়ারপোর্ট থেকে পিক ড্রপসহ নানান কিছু। কিন্তু যখনই এয়ারপোর্টে পৌঁছবেন; পিকআপ করার লোক থাকবে না। ড্রাইভারকে ফোন করেন, প্যাকেজ নিয়ে হোটেলে গেলে সমস্যা, ফুড নিয়েও। তারপর তারা আপনাকে যে এয়ারলাইন্সের টিকিট দেবে, সেখানে সব থাকবে তাদের মেইল। যার ফলে এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পরিবর্তন বা দরকারে আপনি কোনও তথ্যই পাবেন না। সব যাবে তাদের মোবাইলে। তারা আপনাকে জানাবে না। আপনি এতেও ভোগান্তিতে পড়বেন। এজন্য আপনাকে উল্টো টাকা দিয়ে ফের টিকিট করতে হবে।
এমন নানা ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তি চায়। এসব বিষয়ে ট্যুরিজম বোর্ড, এসোসিয়েশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। বিজ্ঞাপনে অবশ্যই শর্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন-প্যাকেজের তারিখ লিখে দিয়ে মানুষকে প্রতারণা থেকে মুক্তি দিতে সংশ্লিষ্ট মহল দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী