তাপস রায় : নিন্দুকেরা বলেন, ঢাকার শিশুকিশোরেরা নাকি ধান গাছ চেনে না। কথাটি বাড়িয়ে বলা হলেও এই শিশুকিশোরদের অনেকেই যে গ্রামের পুকুরে মাছের অবাধ সাঁতার কেটে বেড়ানো, ছিপ ফেলে মাছ ধরার আনন্দ অথবা হাট থেকে খাল-বিল, পুকুরের তাজা মাছ কিনে কানকোতে রশি বেঁধে বাবার বাড়ি ফেরার দৃশ্য উপভোগ করেনি এ কথা বলা যায়।
অভিভাবকেরা চাইলে এই নগরীর শিশুরাও এখন এমন দৃশ্য দেখার সুযোগ পাবে। সুযোগটি করে দিয়েছে উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে গাউসুল আজম এভিনিউয়ে অবস্থিত ‘নাইয়্যাড লাইভ ফিস’। বিষয়টি দেখার জন্য সরাসরি যখন হাজির হলাম তখন সেখানে ক্রেতার ভিড় চোখে পড়ল। উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে থাকেন চাকরিজীবী রতন খন্দকার।
তিনি ছেলে আইয়ানকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন মাছ কিনতে। সাদা কাচের বিশাল আকৃতির অ্যাকুয়ারিয়ামে সাঁতার কাটছে রুই, কাতল, কালবাউশ, মৃগেল, তেলাপিয়া মাছ। একপাশে শিং-মাগুর মাছও চোখে পড়ল। আইয়ান চোখের সামনে এতগুলো মাছের সাঁতার কাটা দেখে ভীষণ অবাক! একবার সে হাত তুলে দেখিয়ে বলছে, আব্বু ওইটা নাও। পরক্ষণেই বলছে, না, না, ওইটা বড়, আমি ওটা নেব।
আইয়ানের সিদ্ধান্তহীনতায় দোকানি মিসির আলী বললেন, ওকে, তুমি আগে পছন্দ করো। তারপর আমাকে বললেই আমি মাছটি ধরে দেব।
এই ফাঁকে আমি মিসির আলীর মুখোমুখি হলাম। কথাপ্রসঙ্গে যা জানা গেল তার সারমর্ম মোটামুটি এ রকম।
চার বন্ধু। ব্যবসার পাশাপাশি গ্রাহককে ভেজাল মুক্ত তাজা মাছ দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করেন ব্যতিক্রমী এই মাছের দোকান। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তারা মাছ চাষ করছেন। সেখান থেকে প্রতিদিন ভোরবেলা চাহিদামতো মাছ এনে রাখছেন দোকানের অ্যাকুয়ারিয়ামগুলোতে। বিভিন্ন মাছের জন্য রয়েছে পৃথক অ্যাকুয়ারিয়াম। লক্ষণীয় হলো, মাছগুলোর অধিকাংশই দেশী। ক্রেতারা ফরমালিনমুক্ত জীবন্ত দেশী মাছ কিনতে নাইয়্যাড লাইভ ফিসে আসছেন।
অ্যাকুয়ারিয়াম যত বড়ই হোক তা তো আর পুকুর নয়, ফলে মাছ মারা গেলে সেগুলো কী করেন এমন প্রশ্নের জবাবে মিসির আলী বলেন, এমন খুব কম ঘটে। কারণ চাহিদা বুঝেই পুকুর থেকে মাছ তোলা হয়। এর মধ্যে যদি কোনোটা মারা যায়, তাহলে হিমায়িত করে বিক্রির ব্যবস্থা আছে। চাইলে যে কেউ একটু কম দামে মাছগুলো কিনতে পারবেন।
চার বন্ধুর একজন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার হাসিবুল হোসাইন শান্ত। তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোরে পুকুর থেকে মাছ ওঠানোর পর পাইকারি বিক্রেতারা কিনে নিয়ে যান। আর বাকিগুলো বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই দোকানে নিয়ে আসা হয়।
পুকুর থেকে তোলার পর মাছগুলো প্রথমে ময়লা পরিষ্কারের জন্য নেওয়া হয় ডাম্পিং হাউসে। কেননা মাছের গায়ে পুকুরের ময়লা লেগে থাকে। ডাম্পিং হাউস থেকে ময়লা পরিষ্কার করে মাছগুলো বিক্রির উপযোগী করে অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা হয়।
‘নাইয়্যাড’ গ্রীক পুরাণের জলদেবী। মাছের সম্পর্ক যেহেতু জলের সঙ্গে আর এগুলো নিয়েই যেহেতু চার বন্ধুর ব্যবসায়ীক কর্মকাণ্ড সে কারণেই প্রতিষ্ঠানটির এমন নাম রাখা হয়েছে। এখান থেকে পছন্দমতো জীবন্ত মাছ কিনে আপনি চাইলেই যেমন কানকোতে বেঁধে ঝুলিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন, তেমনি আঁশ ছাড়িয়ে মাছ কেটে নেয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে। এ জন্য গ্রাহককে বাড়তি টাকা দিতে হবে না।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ জুন ২০১৪/তাপস রায়