সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বেঞ্চিং’ নিয়ে একাধিক মিম চোখে পড়েছে? ‘সিচুয়েশনশিপ’, ‘বেঞ্চিং’, ‘ব্রেডক্রাম্বিং’-এর মতো শব্দগুলোও নিশ্চয় শুনে ফেলেছেন। শব্দগুলো শুনতে নতুন, আবার গুগল করলে যে মানে পাওয়া যায়, তাতে বিষয়টা আরও একটু জটিল লাগে। এমন অভিজ্ঞতা যদি হয়ে থাকে, তাহলে ধরে নেওয়াই যায় আপনি মিলেনিয়াল।
১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, তারাই মিলেনিয়াল বা জেন ওয়াই। প্রেম-ভালবাসার ক্ষেত্রে এত শব্দ, এত লেবেল, এত জটিলতার ভিড়ে তাদের পড়তে হয়নি বললেই চলে। কিন্তু ঠিক এর পরের প্রজন্ম, ইন্টারনেট সংস্কৃতিতে যাদের বলা হয় জেন জেড বা জেন জি জেনারেশন। এই প্রজন্ম এসব শব্দ নিয়েই সম্পর্কের হিসেব কষে।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যাদের জন্ম এই প্রজন্ম জেন জি। এরা কিন্তু বড় হয়েছে মিলেনিয়ালদের সঙ্গে। ফলে নয়ের দশকের ‘ওল্ড স্কুল’ প্রেম আর আজকের ডেটিং অ্যাপের ‘লেফট–রাইট সোয়াইপ’—দুইয়ের সঙ্গেই তাদের পরিচয় আছে। কিন্তু মোবাইল, ইন্টারনেট আর ডেটিং অ্যাপের দৌলতে প্রেমের ভাষা যে গতিতে বদলাচ্ছে, তাতে ‘লেট নাইন্টিজ কিড’রা কতটা আপডেট থাকতে পারছে? আর কতটাই বা নিজেদের পুরনো দিনের ‘ওল্ড স্কুল টাইপ’ বলে ভাবতে পারছে?
নতুন শব্দের জন্ম কোথা থেকে? সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘সিচুয়েশনশিপ’, ‘বেঞ্চিং’, ‘ব্রেডক্রাম্বিং’-এর মতো শব্দ। শুধু তাই নয় ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’-এর যুগও নাকি প্রায় অতীত। এখন জেন জিরা বেশি ব্যবহার করে ‘বেজ ফ্ল্যাগ’ বা ‘পিঙ্ক ফ্ল্যাগ’-এর মতো টার্ম। কিছু শব্দ ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পাচ্ছে। যেমন ‘রিজ’ (Rizz), যা ২০২৩ সালে অক্সফোর্ড প্রেসের ‘ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। অর্থাৎ, এখন এই শব্দের অর্থ আপনি অক্সফোর্ড অভিধানেই খুঁজে পাবেন।
ডেটিং অ্যাপ জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসে রাইট–লেফট সোয়াইপের সংস্কৃতি। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, বিশ্বের প্রথম ডেটিং ওয়েবসাইট match.com চালু হয় ১৯৯৫ সালে। পশ্চিমে ডেটিং তখন থেকেই তুলনামূলক স্বাভাবিক হলেও, আমাদের সংস্কৃতিতে প্রেমের গ্রহণযোগ্যতা ছিল আলাদা রকমের। ধীরে ধীরে কফি ডেট ধারণা পপুলার কালচার আর দৈনন্দিন জীবনে জায়গা করে নেয়। প্রেমে ‘না’ শোনা কারও পছন্দ নয় বলেই হয়তো ‘প্রেম’ থেকে ‘ডেটিং’-এর পরিভাষা বদলেছে, আর তার সঙ্গে বদলেছে প্রেমের ভাষাও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যেখানে মুহূর্তে মতামত তৈরি হয়, সম্পর্কের স্টেটাস নিয়েও থাকে নানা ব্যাখ্যা, সেখানে জেন জিদের প্রেমের ভাষা কি সত্যিই এত জটিল? বিশেষ করে মিলেনিয়ালদের কাছে? ভারতের অ্যাডামাস ইউনিভার্সিটির সহ-অধ্যাপক সংহিতা স্যানাল বলছেন, “জেন জ়েড ডেটিং অ্যাংজাইটি নিতে চায় না। তাদের জীবনে প্রেমের পাশাপাশি আরও অনেক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কের সমীকরণ স্পষ্ট না হলে, প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই তারা ‘সিচুয়েশনশিপ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এতে একদিকে সম্পর্ক অস্বীকারও করা হলো না, আবার প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার দায়ও নিতে হলো না। কিন্তু এই সম্পর্ক প্রায়ই একতরফা হয়—অন্য মানুষটি হয়তো বিষয়টা একইভাবে দেখে না।”
এই প্রসঙ্গে সমাজকর্মী ও গায়িকা পিয়া চক্রবর্তীর বক্তব্য আরও পরিষ্কার, “এ ধরনের পরিস্থিতি প্রেমে আগেও ছিল। শুধু তখন এর কোনও নাম ছিল না। এখন সেই জটিল অনুভূতিগুলো এক কথায় প্রকাশ করা যাচ্ছে—‘সিচুয়েশনশিপ’, ‘ব্রেড ক্রাম্বিং’-এর মতো শব্দের মাধ্যমে।”
শেষে বলা যায়, প্রেম বদলায়নি, বদলেছে তার ভাষা। আর সেই ভাষা বুঝে উঠতে গিয়েই মিলেনিয়ালরা আজ খানিকটা বিভ্রান্ত, খানিকটা কৌতূহলী।
সূত্র: ইটিভি নাইন