ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় টেপ লাগানো একটি ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যা নিছক কৌতূহলের নয়, বরং আধুনিক সাইবার যুগে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে নেটজেনদের।কারণ, ইসরায়েল এমন একটি দেশ, যাকে বিশ্বজুড়ে সাইবার নজরদারি, হ্যাকিং প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল গোয়েন্দা সক্ষমতার শীর্ষ শক্তিগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। অথচ সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেই যদি ফোনের ক্যামেরা ঢেকে রাখেন, তাহলে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোন কতটা নিরাপদ— সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
ইন্ডিয়া টুডে জানায়, সাইবার যুদ্ধ ও ডিজিটাল নজরদারিতে ইসরায়েল বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী দেশ। মোসাদের হাতে হিজবুল্লাহর যোগাযোগযন্ত্র অকার্যকর করা, পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক বসানো, এমনকি স্মার্টফোনে দূর থেকে নজরদারি চালাতে সক্ষম ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যারের মতো প্রযুক্তি— সব মিলিয়ে ইসরায়েলের সক্ষমতার তালিকা বেশ দীর্ঘ।তবুও সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের ফোনের ক্যামেরায় টেপ লাগিয়ে রাখছেন— যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নের ঝড় নেতানিয়াহুর এই ছবির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন বহু ব্যবহারকারী। একজন লিখেছেন, “যদি শিন বেট, মোসাদ আর সামরিক গোয়েন্দা সুরক্ষায় থাকা একজন প্রধানমন্ত্রীও নিজের ফোনে আস্থা না রাখতে পারেন, তাহলে আমরা কীভাবে নিশ্চিন্ত থাকব?” এক্স (সাবেক টুইটার)-এ বিনিয়োগকারী ও ইনফ্লুয়েন্সার মারিও নওফাল প্রশ্ন তুলেছেন, “নেতানিয়াহু কেন ফোনের ক্যামেরায় টেপ লাগিয়েছেন? তিনি কাকে ভয় পাচ্ছেন? এর অর্থ সাধারণ মানুষের জন্য কী?”
ক্যামফেক্টিং: অদৃশ্য কিন্তু ভয়ংকর হুমকি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সতর্কতার পেছনে থাকতে পারে ‘ক্যামফেক্টিং’ নামের এক ভয়ংকর সাইবার হুমকি। ক্যামফেক্টিং হলো এমন এক ধরনের সাইবার আক্রমণ, যেখানে হ্যাকাররা ব্যবহারকারীর অজান্তেই মোবাইল বা কম্পিউটারের ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর মাধ্যমে ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও ধারণ করে গুপ্তচরবৃত্তি, ব্ল্যাকমেইল বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়।
নর্টন সাইবার সিকিউরিটির তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান (RAT) ব্যবহার করেই এই ধরনের আক্রমণ চালানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী কোনো সতর্ক সংকেতও পান না।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইরানি হ্যাকার গ্রুপ ‘হানদালা’ দাবি করে, তারা ইসরায়েলের সাবেক বিচারমন্ত্রী আয়েলেত শাকেদের ফোন হ্যাক করেছে। তারা তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি প্রকাশ করে। একই গ্রুপ নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ তজাচি ব্রাভারম্যানের ফোনেও প্রবেশের দাবি করে বলে জানায় ওয়াই-নেট নিউজ। এই ঘটনাগুলোর পর আরব মিডিয়ায় নেতানিয়াহুর ক্যামেরা-ঢাকা ফোন নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়।
ইসরায়েলের ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টরেট জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশটি ২৬ হাজারের বেশি গুরুতর সাইবার হামলা মোকাবিলা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি। সাইবারটেক গ্লোবাল কনফারেন্সে সংস্থাটির প্রধান ইয়োসি কারাদি বলেন, “ডিজিটাল যুদ্ধ এখন বাস্তব যুদ্ধের সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু মৌলিক সতর্কতা মেনে চলা জরুরি— যেমন নিয়মিত ফোন ও অপারেটিং সিস্টেম আপডেট রাখা, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন অনুমতি বন্ধ করা, সন্দেহজনক লিংক বা ইমেইল এড়িয়ে চলা, শুধু অফিসিয়াল অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং পাবলিক ওয়াইফাইয়ে ভিপিএন ব্যবহার করা আর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়— ক্যামেরার ওপর টেপ লাগানো।
উল্লেখ্য, নেতানিয়াহু ঠিক কী কারণে ফোনের ক্যামেরায় টেপ লাগিয়েছেন, সে বিষয়ে ইসরায়েল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তিসংগত সতর্কতা।