সাতসতেরো

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের রমজান যেমন ছিল

ইসলাম নেক কাজে পূর্বসূরীদের অনুসরণ করতে উৎসাহ দেয়। যেন পরবর্তীরা তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদেরকেই আল্লাহ সৎ পথে পরিচালিত করেছেন, সুতরাং তুমি তাদের পথের অনুসরণ করো।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৯০)

তাফসিরবিদরা বলেন, আয়াতে পূর্বসূরী বুজুর্গ ও আলেমদের অনুসরণের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। তবে শর্ত হলো, তাদের কাজ ও আমল কোরআন ও হাদিসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। পবিত্র রমজান মাসে পূর্বসূরী আলেমদের ইবাদত ও আল্লাহপ্রেমের সাধনা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই আল্লাহর কয়েকজন প্রিয় বান্দার রমজান উদযাপনের চিত্র তুলে ধরা হলো।

মহানবী (সা.) : রমজান মাসে মহানবী (সা.) ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। বিশেষত তিনি অধিক পরিমাণে তিলাওয়াত ও তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। ফাতেমা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তাঁর পিতা তাঁকে বলেছেন, তিনি প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.)-কে একবার কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। কিন্তু মৃত্যুর বছর তিনি তাঁকে দুইবার কোরআন শোনান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২৮৫)

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক আসত তখন নবী (সা.) তাঁর লুঙ্গি কষে বেঁধে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০২৪)

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) : রমজান মাসের প্রতি রাতে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক দিরহাম করে প্রদান করতেন যেন তারা ইফতার করতে পারে। আর নবীজি (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীদের এই সময় দুই দিরহাম প্রদান করা হতো। উসমান (রা.) দায়িত্ব লাভের পর এই অনুদানের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন। এতে যুক্ত হয় মসজিদে ইবাদতকারী, ইতেকাফকারী, পথিক, দরিদ্র ও মিসকিন ব্যক্তি। 

আসওয়াদ ইবনে নাখয়ি (রহ.) : তিনি প্রত্যেক সাত রাতে একবার কোরআন খতম করতেন। আর রমজান মাসে প্রত্যেক দুই রাতে একবার কোরআন খতম করতেন। 

হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান (রহ.) : তিনি রমজানের প্রতি সন্ধ্যায় ৫০ ব্যক্তিকে ইফতার করাতেন। ঈদের রাতে তিনি তাদেরকে কাপড় প্রদান করতেন।

উলুপ আরসালান : সেলজুক শাসক উলুপ আরসালান ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। তিনি প্রত্যেক রমজানে বলখ, মার্ভ, হাররাহ ও নিশাপুর শহরে চার হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করতেন। এবং এই মাসে নিজ হাতে ১০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করতেন। 

সাহিব ইবনে আব্বাদ (রহ.) : রমজান মাসে আসরের পর কেউ তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁকে ইফতার করাতেন। রমজানের প্রত্যেক রাতে তিনি এক হাজার ব্যক্তিকে উপহার প্রদান করতেন। 

কাজি ইসামুদ্দিন আবুল খায়ের (রহ.) : তিনি ছিলেন উসমানীয় আমলের বিখ্যাত আলেম ও শিক্ষক। তিনি রমজান মাসের প্রতি রাতে তাঁর ছাত্রদের ইফতার করাতেন। তিনি বলেন, আমি শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি অভ্যাস গড়ে তুলেছি। তা হলো, প্রতিবছর আমি তাফসিরে বায়জাবির (যার প্রকৃত নাম আনওয়ারুত তানজিল ওয়া আসরারুত তাবিল) একটি অনুলিপি তৈরি করে এবং তা তিন হাজার দিরহামে বিক্রি করি। অর্জিত অর্থ রমজান মাসে শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য ব্যয় করি।

আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রহ.) : তিনি ছিলেন বিখ্যাত তাবেয়ি। তাবেয়িরা রমজান মাসে রাতের বেলা দীর্ঘ সময় নামাজ আদায় করতেন। তিনি বলেন, আমরা রমজান মাসে রাতের নামাজ থেকে ফিরে সময় ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে খাদেমদের তাড়াতাড়ি খাবার আনতে বলতাম। অর্থাৎ তাঁরা সাহরির সময় কিছুক্ষণ অবশষ্টি থাকা পর্যন্ত নামাজ আদায় করতেন।

উল্লিখিত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, পূর্বসূরী আলেমরা রমজান এলে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে আরো বেশি আত্মনিয়োগ করতেন। বিশেষত তারা কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, তাহাজ্জুদ আদায় এবং এতিম অসহায় ও রোজাদারদের সেবাদানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতেন।

সূত্র : ইসলাম ওয়েব ডটনেট, মুলতাকাল খুতাবা ও ইসলাম অনলাইন ডটনেট