সাতসতেরো

প্রকাশিত হয়েছে আবু ইউসুফের ‘যেহেতু প্রেম আরবীয় হাওয়া’ 

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়েছে কবি ও অনুবাদক আবু ইউসুফ-এর ‘যেহেতু প্রেম আরবীয় হাওয়া’। কাব্যগ্রন্থটি এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে। এটি প্রকাশ করেছে অনুজ প্রকাশন। বইমেলায় ‘যেহেতু প্রেম আরবীয় হাওয়া’ বইটি পাওয়া যাচ্ছে (৩৩৩-৩৩৬) নম্বর স্টলে।  আবু ইউসুফের অনুবাদভাবনাসহ ‘যেহেতু প্রেম আরবীয় হাওয়া’ থেকে কয়েকটি কবিতা রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। 

আবু ইউসুফ-এর কবিতা অনুবাদভাবনা: ‘‘কবিতা কেন অনুবাদ করতে শুরু করেছিলাম, সে কথা ভাবতে গেলেই এক অসীম শূন্যতার অতলান্তে ডুবে যাই। মূলত যা কিছু সৃষ্টি আমার, সেসবের মাঝে এই ‘আরবীয় হাওয়া’ আজ এক বিশেষ দহন নিয়ে উপস্থিত।

আমি যখন এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসলাম, আমার সামনে শুধু শব্দ ছিল না; বরং ছিল আরব ভূখণ্ডের হাজার বছরের হাহাকার। আমার মনে হয়েছে, কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করে গেলে সেই তপ্ত মরুর নিঃশ্বাসকে বাংলার স্নিগ্ধতায় ধরা অসম্ভব। তাই আমি বেছে নিয়েছি এক কণ্টকাকীর্ণ পথ—যা কবিতার ‘মেরুদণ্ড’ অটুট রেখে তার না-বলা কথাগুলোকে নতুন করে মুক্তি দিয়েছে।

আমার কাছে অনুবাদ কোনো যান্ত্রিক ভাষান্তর নয়; এ এক গভীর ‘ভাবান্তর’। একজন কবি যখন লেখেন, পঙ্‌ক্তির আড়ালে অনেক না-বলা হাহাকার তিনি লুকিয়ে রাখেন। আমি একজন কবি হিসেবে অন্য একজন ভিনদেশি কবির সেই অব্যক্ত যাতনা, মর্মার্থ আর নিঃশব্দ অনুভবগুলোকে ধরতে চেয়েছি।

আমি যদি কেবল শব্দের পিঠে শব্দ বসিয়ে যেতাম, তবে আমার কবি-সত্তার দায়বদ্ধতা থাকত কোথায়? মিশর, ফিলিস্তিন, ইরাক কিংবা লেবাননের মতো বিচিত্র জনপদের কবিদের সেই গাম্ভীর্য আর আর্তি আমি আমার নিজের হৃদয়ে ধারণ করেছি; তারপর তাকে বাংলার অক্ষরে রূপ দিয়েছি।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, এডওয়ার্ড ফিৎজেরাল্ড যখন ওমর খৈয়ামকে-কে অনুবাদ করেছিলেন, তখন তিনি আক্ষরিক অনুবাদের দাসত্ব করেননি। তিনি খৈয়ামের রুহকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন বলেই আজ বিশ্বসাহিত্যে তা অমর হয়ে আছে।

প্রতিটি মহৎ সৃষ্টিই আসলে এক একটি বিপ্লবের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়। একসময় গদ্য কবিতাকেও কেউ স্বীকার করতে চায়নি; অথচ আজ তা-ই মানুষের সবচেয়ে কাছের আশ্রয়। আমার বিশ্বাস, অনুবাদের এই নতুন ধারাটিও সময়ের হাত ধরে একদিন এভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠবে।

‘আরবীয় হাওয়া’ কেবল একটি বই নয়; এ আমার এক দীর্ঘ আত্মিক সংগ্রামের ফসল। যদি এই পঙ্‌ক্তিগুলো পাঠকদের হৃদয়ে সেই ‘অপ্রকাশিত’ সত্যের অনুরণন তুলতে পারে, তবেই একজন স্রষ্টা হিসেবে আমার এই রক্তক্ষরণ সার্থকতা পাবে।’’

জীবনের দাবি আবুল কাসেম আশ-শাবি (তিউনিসিয়া)

যদি কোনোদিন মানুষ সত্যিই জীবনের দাবি তোলে— তবে নিয়তিকে সাড়া দিতেই হবে। রাত্রিকে গুটিয়ে নিতে হবে তার অন্ধকার, শৃঙ্খলকে শিখে নিতে হবে ভাঙার ব্যাকরণ। যার বুকে জীবনের জন্য ব্যাকুলতা জাগেনি, সে বাতাসে উড়ে যাওয়া ধূলির মতো মিলিয়ে যায়— অদৃশ্য, অচিহ্ন। অভিশাপ তার জন্য— যাকে জীবন কখনও আঘাত করেনি অস্তিত্বহীনতার বিজয়ী চড় মেরে। এভাবেই আমাকে বলেছে সৃষ্টিজগত, তার গোপন আত্মা কানে কানে জানিয়েছে; পাহাড়ের গায়ে, বৃক্ষের নিচে, উপত্যকার ভেতর বাতাস ফিসফিস করে উচ্চারণ করেছে— যখনই আমি কোনো লক্ষ্যের দিকে হাত বাড়িয়েছি, স্বপ্নের পিঠে চড়ে বসেছি নির্ভয়ে, দুর্গম পথ এড়িয়ে যাইনি, আগুনের পাক খাওয়া শিখাকেও ভয় করে! ***  স্বাধীনতার স্বাদ খলিল জিবরান (লেবানন)

তুমি স্বাধীন— রোদের সামনে দাঁড়িয়ে, রাতের চাঁদ–তারার কাছে হিসাব না দিয়ে। তুমি তো স্বাধীন— যেখানে কোনো আকাশ নেই, নেই কোনো গ্রহ, এমন কি আলোও যেখানে ছুটি নিয়েছে। চোখ বন্ধ করলেও তুমি স্বাধীন, পুরো পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও!

কিন্তু যাকে তুমি ভালোবাসো, তার কাছে তুমি গোলাম।  ভালোবাসা মানে তো নিজেকে স্বেচ্ছায় হারিয়ে ফেলা। যে তোমাকে ভালোবাসে, তার ভালোবাসার ভিতরেই তুমি হারিয়ে যাও—  আর এই হারিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে গভীর স্বাধীনতা। *** 

অনির্বাচিত বাগান নিযার কাব্বানী (সিরিয়া) 

তুমি আবারও জিজ্ঞেস করো, আমি কি তোমাকে ভালোবাসি?

শোনো, এই প্রেম কোনো নির্বাচিত বাগান নয়, যেখানে ইচ্ছেমতো ফুল তুলতে যাওয়া যায়। এই প্রেম বরং সেই সমুদ্র— যার কিনারে দাঁড়ালে জল কাছে টেনে নেয়, তুমি চাইলেও বা না চাইলেও!

তোমাকে ভালোবাসা তো এমন, সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতক যেমন জিজ্ঞেস করে না, কবে আসব পৃথিবীতে। যেমন মৃত্যু আসে হঠাৎ, কোনো দরজায় কড়া না করেই।

তোমাকে ভালোবাসা তো আমার কাছে ঈশ্বরের নীরব আদেশ! আমি শুধু মানি, যেমন এক তীব্র ঝড়ের পর গাছের ভাঙা ডাল! যেমন আগুনে জ্বলে যাওয়ার পর ছাইয়ের অনিবার্যতা! ***  রিতা ও বন্দুক মাহমুদ দারবিশ (ফিলিস্তিন)

রিতা আর আমার চোখের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বন্দুক— যেন ইতিহাসের কালো আঙুল। যে রীতাকে চেনে, সে ঝুঁকে পড়ে— তার মধুরঙা চোখে ঈশ্বরের আবাস টের পায়। আমি রীতাকে চুমু খেয়েছিলাম— যখন তার বয়স ছিল ঘাসের মতো নরম; মনে আছে, সে কীভাবে আমার গায়ে লেগে থাকত, তার বেণী আমার বাহু জড়িয়ে রাখত লতার মতো। রিতাকে আমি মনে করি— যেমন তৃষ্ণার্ত পাখি মনে রাখে তার গোপন জলধারা।

আহ, রিতা— এখন আমাদের মাঝখানে লক্ষ পাখির ডানা ঝাপটায়, লক্ষ ছবির ধুলো উড়ে, অসংখ্য প্রতিশ্রুতির কাঁচ ভেঙে পড়ে— সব কিছুর উপর গুলি ছুড়েছে সেই বন্দুক। রিতার নাম ছিল আমার ঠোঁটে উৎসবের শিখা, তার শরীর আমার রক্তে এক গোপন বিবাহ। দুই বছর আমি হারিয়ে ছিলাম রীতার ভেতর, দুই বছর সে ঘুমিয়েছে আমার বাহুর উপর। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সবচেয়ে সুন্দর পেয়ালার কাছে— আর ঠোঁটের মদের আগুনে ধীরে ধীরে পুড়েছিলাম। আমরা দু’বার জন্মেছিলাম।

আহ, রিতা— কী এসে দাঁড়াল আমার চোখ আর তোমার চোখের মাঝখানে? দুই টুকরো ঘুম? কিছু মধুরঙা মেঘ? না— এই বন্দুকের আগেও এক পৃথিবী ছিল। সন্ধ্যার গভীর নীরবতা ছিল, একটি চাঁদ ছিল—যে ভোর হলে দূরে সরে যেত তোমার সেই মধুরঙা চোখের ভেতর থেকে। শহর সব গায়কদের ঝেঁটিয়ে সরিয়ে দিয়েছে, তবু রিতা থেকে গেছে— একটি স্মৃতি হয়ে, একটি ক্ষত হয়ে। রিতা আর আমার চোখের মাঝখানে— এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই বন্দুক।