সাতসতেরো

বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি: নাগরিক বিপন্নতা ও অন্তর্জীবনের ব্যবচ্ছেদ

জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় এক বিষণ্ণ, ক্লান্ত ও প্রজ্ঞাবান মানুষের চিত্র এঁকেছিলেন, যিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এইসব নিভৃত কুহক/ আমরা কি আর হলাহলে মাথা দিই?’ জীবনের এই ‘নিভৃত কুহক’ বা মায়াময় বিভ্রম একবার যে ধরে ফেলতে পারে, জগতের ইঁদুর-দৌড়, প্রাত্যহিক জীবনের বিষবাষ্প বা ‘হলাহল’-এর প্রতি তার আর কোনো মোহ থাকে না। সে তখন নিজের ভেতরে এক নিভৃত অবগাহন তৈরি করে নেয়। কথাসাহিত্যিক অলাত এহসানের ‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’ গল্পগ্রন্থের চরিত্রগুলো যেন জীবনানন্দের সেই বিষণ্ণ অথচ প্রজ্ঞাবান বোধেরই গদ্যরূপ। এই গ্রন্থের চরিত্রগুলো প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র, সমাজ ও পুঁজির যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক স্তরে পৌঁছে যায়, যেখানে তারা নিজেদের জন্য এক নিজস্ব পরাবাস্তব বা অন্তর্লীন জগৎ তৈরি করে নিতে বাধ্য হয়।

অলাত এহসান মূলত গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, যার ভেতরে বাস করে এক তীব্র রাজনীতি-সচেতন সত্তা। ছাত্রজীবনে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত থাকার যে অভিজ্ঞতা, তা তাঁর কলমকে শাণিত করেছে। তবে তাঁর গল্পের রাজনীতি স্লোগানসর্বস্ব নয়; বরং তা মানুষের দৈনন্দিন যাপন, দীর্ঘশ্বাস এবং নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম রাজনীতির পাঠ। এই গ্রন্থে তিনি সমাজ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, করপোরেট আগ্রাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে চলা ‘উত্তর-সত্য’ বা কপটতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন অত্যন্ত সাবলীল অথচ তীক্ষ্ণ ভাষায়।

বইটির ব্লার্ব বা প্রচ্ছদ-কথায় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন শফিক এবং অনুবাদক অভিজিৎ মুখার্জি যে মন্তব্য করেছেন, তা এই গ্রন্থের অন্তর্নিহিত সুরটি ধরিয়ে দেয়। এহসানের গল্পগুলো শুধু কাহিনী বলে না, বরং ঘটনার পেছনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য স্তরগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করে। বায়েজিদ বোস্তামীর মতে, গল্পকার এহসান কবিতাকার এহসানকে অবদমিত করে গল্পের স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর গল্পের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ডিটেইলিং বা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা।

গ্রন্থটিতে মোট নয়টি গল্প সংকলিত হয়েছে। প্রতিটি গল্পই যেন সমকালীন বাংলাদেশের এবং বৃহত্তর অর্থে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী সমাজের একেকটি ক্ষতচিহ্নের দলিল।

আধুনিক সভ্যতা ও করপোরেট পুঁজি কীভাবে মানুষকে ব্যবহার করে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে, তার দুটি ভিন্ন অথচ সমান্তরাল রূপ দেখা যায় ‘মিজানের ইঁদুর-বিড়াল’ এবং ‘অভাবনীয় সুমিত ও তার কবিতার চিহ্ন আবিষ্কার’ গল্প দুটিতে। ‘মিজানের ইঁদুর-বিড়াল’ গল্পটি ব্রুনেইগামী একদল বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের জীবনের এক বীভৎস বাস্তবতার আখ্যান। মিজান নামের একজন স্বল্পভাষী, কর্মঠ শ্রমিক কীভাবে তার সহকর্মীদের দ্বারা নিগৃহীত ও নির্মমভাবে প্রহৃত হয়, তা এই গল্পের মূল উপজীব্য। মিজানের অপরাধ ছিল সে অন্ধকারে একা বসে থাকত, যা অন্যদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু গল্পের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বা টুইস্ট আসে একেবারে শেষে। গল্পের কথক বা সুপারভাইজার, যাকে আমরা এতক্ষণ মিজানের প্রতি সহানুভূতিশীল একজন দর্শক বলে মনে করছিলাম, সেই কথকই নির্লিপ্তভাবে স্বীকার করে যে, মিজানকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য পুরো পরিস্থিতিটি তারই সাজানো ছিল! মিজানের ঘরে ইঁদুর ও মৃত বিড়াল রাখার বুদ্ধিটি তারই ছিল, যাতে পরিবেশ ঘোলাটে করে মিজানকে পাগল সাব্যস্ত করে বের করে দেওয়া যায়। এই গল্পটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে করপোরেট কাঠামোর নিচের স্তরের মানুষেরা একে-অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় এবং সিস্টেমের ভেতরে থাকা মধ্যবিত্ত ‘সুপারভাইজার’ শ্রেণি কীভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিম্নবিত্তের জীবন নিয়ে ইঁদুর-বিড়াল খেলায় মেতে ওঠে। মিজানের ক্ষতবিক্ষত মুখচ্ছবি আসলে গ্লোবাল সাউথের শোষিত শ্রমিকেরই চিরন্তন মুখ।

অন্যদিকে ‘অভাবনীয় সুমিত ও তার কবিতার চিহ্ন আবিষ্কার’ গল্পটিতে আমরা দেখি হোয়াইট কলার জব বা শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসের ভেতরের আরেক ধরনের নিষ্ঠুরতা। চল্লিশোর্ধ্ব সুমিত আহমেদ, যিনি গান শোনেন, বই পড়েন এবং যাঁর ভেতরে একটি সংবেদনশীল মানুষের বাস, তিনি কীভাবে করপোরেট রাজনীতির শিকার হয়ে অফিস থেকে ছিটকে পড়েন, তা লেখক নিখুঁতভাবে চিত্রিত করেছেন। মিথিলা নামের এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে হওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে অফিস পলিটিক্সের যে নোংরা খেলা শুরু হয়, তাতে সুমিত পরিণত হয় ‘গন কেস’ বা অপ্রকৃতিস্থ মানুষে। সুমিত যখন তার অতি আদরের বইগুলো বিলিয়ে দেয়, তখন আমরা বুঝতে পারি সে শুধু একটি চাকরি হারায়নি, সে আসলে সমাজের এই নির্দয় কাঠামোর কাছে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকেও বিসর্জন দিচ্ছে। করপোরেট ‘ল্যাংমারা’ কীভাবে একজন মানুষের অন্তর্জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, এই গল্প তার এক অসামান্য দলিল।

শহর কীভাবে মানুষকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করে, তা অলাত এহসানের গল্পের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। ‘কয়েকটি কাঠগোলাপ’ গল্পের কথক নিজেকে তুলনা করে শহরের ডাস্টবিনের সঙ্গে। সে একজন কদাকার, গ্রামান্তরিত মানুষ, শহরের বছিলা বেড়িবাঁধের শ্রমিক বস্তিতে যার বাস। টেম্পোর কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করা এই মানুষটির জীবনে কোনো রোমান্স নেই, কেউ তার দিকে ফিরে তাকায় না। কিন্তু এই ‘নিরেট মাথার কামলাখাটা’ মানুষটির ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যবোধ। সে কানে কাঠগোলাপ গুঁজে রাখে। একদিন ফুটওভার ব্রিজে এক্সেসরিজ বিক্রেতা এক মেয়ে তার কাছে একটি কাঠগোলাপ চেয়ে নেয় এবং নিজের নাম বলে ‘কাঠগোলাপ’। এই ছোট্ট ঘটনাটি যেন শহরের বিশাল নর্দমার ওপর ফুটে থাকা একটি পদ্মফুলের মতো। সমাজের চোখে যারা ‘বর্জ্য’, লেখক তাদের ভেতরের সেই নিভৃত হাহাকার ও সৌন্দর্যের তৃষ্ণাকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মেয়েটি শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায়, হয়তো শহরের অন্য কোনো অন্ধকার গলিতে বিক্রি হয়ে যায়, কিন্তু ওই কাঠগোলাপটি যেন শহরের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার আদিম বাসনার প্রতীক হয়ে থাকে।

বিচ্ছিন্নতার আরেক চরম রূপ আমরা দেখি ‘ষষ্ঠ দরজার ওপাশে’ গল্পে। একটি পরিবারের বাবা হঠাৎ একদিন নিজের স্টাডি রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন এবং আর কখনোই বের হন না। তিনি নিজের ভালো চাকরি, পেনশন সব ছেড়ে দিয়ে স্বেচ্ছা-নির্বাসন বেছে নেন নিজেরই ঘরের একটি কক্ষে। তিনতলা বাড়ির নিচতলায় বসবাস করা একটি পরিবার কীভাবে একে অপর থেকে মানসিকভাবে যোজন যোজন দূরে সরে যেতে পারে, তার এক পরাবাস্তব কিন্তু পরিচিত চিত্র এটি। বাবার এই হঠাৎ দরজা বন্ধ করে দেওয়া আসলে আধুনিক জীবনের অর্থহীনতা ও ক্লান্তির প্রতি এক চরম অনাস্থা জ্ঞাপন।

বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী ও সরাসরি রাজনৈতিক গল্প বোধ হয় ‘পুরোনো ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের রহস্য’। গল্পে কথক ফুটপাতের এক ভাঙারির দোকানে পুরোনো, ফেলে দেওয়া জিনিসের স্তূপের মধ্যে সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের দুটি বাঁধানো ছবি খুঁজে পায়। এই একটি দৃশ্যই সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়কে একটি ফ্রেমে বন্দি করে ফেলে।

যে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ছবি একসময় সযত্নে ঘরের দেয়ালে বা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে টাঙানো থাকত, তা কীভাবে স্থান পেল ডাস্টবিনে বা ভাঙারির দোকানে? ভাঙারি দোকানির কাছে এই ছবির কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই, তার কাছে এটি কেবলই হার্ডবোর্ড ও পলিথিনের একটি পণ্য, যার দাম সে হাঁকায় চারশো বা আড়াইশো টাকা। লেখক অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন, একটি দেশের নাগরিক কখন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ছবি পুরোনো মাল হিসেবে বিক্রি করে দেয়? এই গল্পটি আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের যে ‘লিপ-সার্ভিস’ বা কপটতা, তার গালে এক বিরাট চপেটাঘাত। আমরা ইতিহাসকে ফ্রেমে বাঁধিয়েছি ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করিনি। তাই প্রয়োজন ফুরালে বা সময় পাল্টালে সেই ফ্রেম খুব সহজেই ভাঙারির দোকানে বিক্রি হয়ে যায়। এটি যেন আমাদের জাতীয় বিস্মৃতির এক মর্মান্তিক রূপক।

গ্রন্থের নামগল্প ‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’ একটি ডিস্টোপিয়ান বা পরাবাস্তব আবহে লেখা। এই গল্পে ধানমন্ডি এলাকাটিকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যেন তা এক মৃত, পরিত্যক্ত নগরী, যেখানে কেবল বড় বড় রেস্তোরাঁ, জুয়াড়ি আর মাফিয়াদের রাজত্ব। কথক একদিন ‘নেক হেড বার’ নামের এক পুরোনো কফি হাউসে প্রবেশ করে, যেটি আসলে একদল অথর্ব, বৃদ্ধ মানুষের আড্ডাস্থল। কফি হাউসের ভেতরে বিনা কারণে বাউন্সাররা যখন কথককে পশুর মতো পেটাতে থাকে, তখন সেই বৃদ্ধরা কিছুই করে না। তারা কেবল ঘড়ি ধরে এক মিনিট নীরবতা পালন করে।

এই গল্পটি বাংলাদেশের বর্তমান সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির চরম অবক্ষয় ও নিষ্ক্রিয়তার প্রতীক। ‘কফি হাউস’ একসময় ছিল বাঙালির তারুণ্য, বিপ্লব ও প্রতিবাদের তীর্থস্থান। সেই কফি হাউস আজ পরিণত হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে, যেখানে বসে থাকা মানুষগুলো চোখের সামনে ঘটে যাওয়া চরম অন্যায় ও অবিচারের প্রতিবাদ করার সামর্থ্য হারিয়েছে। তারা কেবল নীরবতা পালনের মাধ্যমে নিজেদের দায় সারে। লেখক এখানে রূপকের আড়ালে সমকালীন সমাজের মেরুদণ্ডহীনতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

‘নাজিবউদ্দিন রোডের পাশে অপেক্ষমাণ ছেলেটি’ গল্পে আমরা এক অদ্ভুত শৈশবের চিত্র পাই। মা তার সন্তানকে একটি বাচ্চা মোরগের সঙ্গে সুতা দিয়ে বেঁধে সারা দিন ফুটপাতে বসিয়ে রাখেন। ছেলেটি সেই জনমানবহীন রাস্তায় বসে বসে জীবনের গন্তব্য সম্পর্কে ভাবতে শেখে। এই গল্পটি মানুষের অস্তিত্বের একাকিত্ব এবং ভবিতব্যের রূপক হিসেবে কাজ করে। চওড়া কিন্তু পরিত্যক্ত রাস্তার ফুটপাতে বসে থাকা ছেলেটি যেন আধুনিক মানুষেরই প্রতিচ্ছবি—যে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, অথচ যার সামনে পড়ে আছে দিগন্তবিস্তৃত এক অর্থহীন পথ।

অন্যদিকে ‘একটি প্রতিশ্রুত ঝড়ের পূর্বাভাস’ গল্পে আবহাওয়াবিদ মঞ্জু মুহম্মদ এমন এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের জন্য অপেক্ষা করেন, যা সমাজকে নতুন করে নির্মাণ করবে। এই ঝড় যেন এক অবশ্যম্ভাবী রাজনৈতিক বা সামাজিক বিপ্লবের প্রতীক্ষা। তিনি নাগরিক জীবন ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন, প্রকৃতি ও লোকায়ত সংস্কৃতির কাছে ফিরে গেছেন। এটি যেন যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তির এক আধ্যাত্মিক ও প্রাকৃতিক অন্বেষণ।

কিছু পর্যালোচনা

অলাত এহসানের ভাষারীতিতে এক ধরনের মগ্নতা ও ধীর লয় রয়েছে। তিনি তাড়াহুড়ো করে গল্প বলে শেষ করতে চান না। বায়েজিদ বোস্তামীর ভাষায়, তার গল্প ‘একটি বিলম্বিত লয়ে ধীরে বয়ে যায়, বাতাস কেটে-কেটে’। এই ধীরগতি পাঠককে প্রতিটি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক স্তরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। তাঁর শব্দচয়নে কাব্যিক সুষমা থাকলেও তা বাস্তবের রূঢ়তাকে আড়াল করে না।

গল্পের কাঠামো নির্মাণে তিনি বেশ আধুনিক। রৈখিক বা লিনিয়ার কাহিনী বলার বদলে তিনি বারবার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যাতায়াত করেছেন। চরিত্রগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব বোঝাতে তিনি প্রায়শই স্বগতোক্তি ও পরাবাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন। ‘মুশার মা আমাদের আত্মীয় হতেন’ গল্পের মতো আত্মজৈবনিক ধাঁচের লেখায় তিনি যেমন নিটোল স্মৃতিকথা ফেঁদেছেন, তেমনি ‘মিজানের ইঁদুর-বিড়াল’ গল্পে পাঠককে একেবারে খাদের কিনারায় নিয়ে সজোরে ধাক্কা দিয়েছেন।

‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’ কেবল একটি গল্পগ্রন্থ নয়, এটি সমকালীন বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি এবং মনস্তত্ত্বের একটি গভীর এক্স-রে রিপোর্ট। অলাত এহসান তাঁর স্বজ্ঞাপ্রসূত প্রজ্ঞার মাধ্যমে আমাদের চারপাশের অতি পরিচিত চরিত্রগুলোর ভেতরের অন্ধকার, হতাশা এবং একইসঙ্গে বেঁচে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন।

যে কোনো পাঠক, যিনি প্রচলিত সস্তা বিনোদনমূলক কাহিনীর বাইরে গিয়ে সাহিত্যকে জীবন ও সমাজ পাঠের মাধ্যম হিসেবে দেখতে চান, এই গ্রন্থটি তাঁকে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা দেবে। হুমায়ূন শফিকের মন্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতেই হয়, সমাজ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে সাবলীল ভাষায় লেখা এই গল্পগুলো পাঠককে শেষ সীমা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে এবং পাঠ শেষে তাকে গভীরভাবে ভাবিত করবে। আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের জগতে এই বইটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী সংযোজন।০

গ্রন্থ: বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি প্রকাশনা : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী ধরন: গল্পগ্রন্থ