কথাসাহিত্যের মূল কাজ কেবল গল্প বলা নয়; সমাজ, সময় ও মানুষের অন্তর্নিহিত সত্যকে শৈল্পিক আবরণে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। বাংলা সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং টিকে থাকার লড়াই বহুবার চিত্রিত হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ কিংবা অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সেই ঐতিহ্যেরই ধারক। একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে সমকালীন গ্রামীণ অর্থনীতির রূঢ় বাস্তবতা, ধর্মান্ধতার আগ্রাসন এবং এক অসহায় অথচ লড়াকু মায়ের জীবনসংগ্রামের অনবদ্য আখ্যান কাজী লাবণ্য রচিত ‘হাজারমুখী রোদসী’।
গ্রন্থিক প্রকাশন থেকে ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত এই উপন্যাসটি আকারে খুব বড় না হলেও এর বিষয়বস্তুর গভীরতা, চরিত্রচিত্রণের নৈপুণ্য এবং সমাজবাস্তবতার নিখুঁত বয়ান এটিকে সমকালীন বাংলা উপন্যাসের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজনে পরিণত করেছে।
শ্যামা থেকে হাজারমুখী উপন্যাসের ভূমিকাতেই লেখক একটি চমৎকার তুলনামূলক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন। গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ধ্রুপদী সৃষ্টি ‘পৌষফাগুনের পালা’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্যামা ঠাকরুনের সঙ্গে এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ময়না বা হাজারমুখীর এক আত্মিক ও ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন রচনা করা হয়েছে। ষাট-সত্তর বছরের সময়ের ব্যবধান থাকলেও এই দুই নারীর নিয়তি এবং লড়াইয়ের ধরন প্রায় অভিন্ন। শ্যামা যেমন তার সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার জন্য দারিদ্র্যের সঙ্গে অবিরাম যুদ্ধ করেছে, ঠিক তেমনি হাজারমুখী তার একমাত্র সন্তান মন্দেলকে ‘শিক্ষিত’ করার স্বপ্নে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। সমাজব্যবস্থা এবং কালের পরিবর্তন ঘটলেও মাতৃত্বের চিরায়ত লড়াই এবং অভাব নামক দানবের সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের যুদ্ধের কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাজারমুখী যেন কালের পরিক্রমায় রূপান্তরিত শ্যামারই একবিংশ শতাব্দীর সংস্করণ। লেখকের এই ঐতিহাসিক বোধ উপন্যাসটিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।
যান্ত্রিক আগ্রাসন ও প্রান্তিক মানুষের বেকারত্ব উপন্যাসের শুরুতেই আমরা এক রূঢ় আর্থসামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হই। প্রযুক্তি কীভাবে নিম্নবিত্ত মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, তার এক নির্মম চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে। অটো রাইসমিলের দাপটে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সনাতনী হাসকিং মিল ও চাতালগুলো। এই চাতালগুলোকে কেন্দ্র করেই ময়নার মতো অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হতো। ধান সেদ্ধ করা, শুকানো, চাল ঝেড়ে বস্তায় ভরার মতো অমানুষিক পরিশ্রম করে তারা দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের সংস্থান করত।
অটো রাইসমিল আসার ফলে এই বিশাল শ্রমিকগোষ্ঠী রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়ে। ময়নার ক্ষোভের মধ্য দিয়ে লেখক মূলত এক সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছেন। ধনী মালিকদের প্রতি ময়নার আক্রোশ—‘ধনী মাইনষের টাকার গরম… এতলা মাইনষের প্যাটের খোরাকি মেশিনের ভেতর ঢুকি দেনেন’—কেবল একজন শ্রমিকের আর্তনাদ নয়; এটি পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় প্রান্তিক মানুষের অসহায়ত্বের সর্বজনীন রূপ। যন্ত্রের কাছে মানুষের এই পরাজয় এবং কর্মহীনতার ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ খাদ্যাভাব উপন্যাসের প্রথম দিকের একটি বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়।
মাতৃত্ব, বাৎসল্য এবং এক জটিল মনস্তত্ত্ব ময়না বা হাজারমুখী উপন্যাসের অবিসংবাদিত প্রাণভোমরা। তার চরিত্রটি বহুমাত্রিক। সারাদিন বকাঝকা করা, গজগজ করা ময়নার বাইরের রূপটি অত্যন্ত রুক্ষ। বছরের ৩৬৫ দিনই সে বকাবকি করে। এই বকাবকি মূলত তার অবদমিত ক্ষোভ, বেঁচে থাকার ক্লান্তি এবং দারিদ্র্যের প্রতি এক ধরনের মৌখিক প্রতিরোধ।
অভাব যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়—এই প্রবাদের সত্যতা ময়নার রুক্ষ আচরণে মিললেও, তার ভেতরে রয়েছে এক মহাসমুদ্রের মতো বিশাল মাতৃসত্তা। ময়নার সংসারে কেবল তার নিজের ছেলে মন্দেল নেই; আছে মাতৃহীন ভাগ্নে রব্বানী এবং একটি শীর্ণকায় কুকুর ‘বাঁশি’। নিজের খাবার না থাকলেও ময়নার মন কাঁদে ভাগ্নের জন্য। ভাগ্নেকে সে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসে। রব্বানীর দাঁতব্যথার কথা শুনে তার ভেতরে যে উদ্বেগ তৈরি হয়, তা কোনো অংশে একজন গর্ভধারিণী মায়ের চেয়ে কম নয়। এমনকি উচ্ছিষ্টভোজী কুকুরটিকেও সে তাড়িয়ে দিতে পারে না। ভাত না পেয়ে কুকুরটি পড়ে থাকলে ময়না তাকে ধমক দেয় ঠিকই, পরক্ষণেই আবার ঝড়ের রাতে সেই কুকুরটিকে বুকে আগলে বাঁচে।
অন্যদিকে নিজের ছেলে মন্দেলের প্রতি ময়নার রয়েছে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। স্বামীর মৃত্যুর পর অমানুষিক পরিশ্রম করে সে ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়িয়েছে। তার স্বপ্ন ছিল ছেলে পাশ করে রোজগার করবে, অভাব দূর হবে। বাস্তবে মন্দেল হয়ে উঠেছে কর্মবিমুখ, ধর্মান্ধ এবং সংসারের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন এক যুবক। ছেলের এই অকর্মণ্যতা ময়নাকে দগ্ধ করে। তবুও মাতৃত্বের অন্ধ মোহে সে ছেলের সব অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। এই রুক্ষ অথচ মমতাময়ী নারীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন লেখক সুনিপুণভাবে এঁকেছেন।
ধর্মব্যবসা ও সামাজিক ভণ্ডামি ‘হাজারমুখী রোদসী’ উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সাহসী দিক হলো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নামে চলা শোষণ ও ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন। লেখক অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মাদ্রাসা ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরেছেন।
খলিল মুন্সি এবং বড় হুজুর চরিত্র দুটির মাধ্যমে ধর্মব্যবসায়ীদের আসল রূপটি চিত্রিত হয়েছে। গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের বেহেশতের লোভ দেখিয়ে এবং দোজখের ভয় দেখিয়ে এরা নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়।
ভর্তির সময় অভিভাবকদের বলা ‘গোস্ত তোমার হাড্ডি হামার’—এই ভয়াবহ বাক্যের আড়ালে শিশুদের ওপর যে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, লেখক তা মর্মান্তিকভাবে বর্ণনা করেছেন। একদিকে ময়না এবং রব্বানীরা যখন ভাতের অভাবে শুকনো মরিচ দিয়ে খুদ ভাজা খাচ্ছে, অন্যদিকে তখন বড় হুজুররা নানা পদের সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে। ধর্মের নামে সমাজে এই যে শ্রেণিবিভাজন এবং সম্পদের পুঞ্জিভবন, উপন্যাসে তার তীব্র সমালোচনা রয়েছে।
খলিল মুন্সি ময়নার বাড়িতে এসে বাম হাতে পানি খাওয়ার জন্য ফতোয়া দেয়, অথচ সেই ময়নার ক্ষুধা মেটানোর কোনো দায় সে বা তার ধর্মব্যবস্থা নেয় না। ময়নার সপাট উত্তর—‘মোর তো দোনোখানে ন্যারা হাত… আল্লাহ এমতোন করি মোক বানাইছে’—মূলত অন্ধ ফতোয়াবাজদের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত।
শৈশবের অপমৃত্যু: রব্বানীর ট্র্যাজেডি উপন্যাসের অন্যতম করুণ চরিত্র রব্বানী। মাতৃহীন এই বালকটি যেন পৃথিবীর সমস্ত বঞ্চনার মূর্ত প্রতীক। খালা ময়নার সংসারে সে নিরলস কাজ করে যায়—গোরু চরানো, রান্নায় সাহায্য করা, বাসন মাজা—সবকিছু সে হাসিমুখে করে কেবল খালার একটু ভালোবাসা পাওয়ার আশায়।
মেলায় যাওয়ার জন্য তার যে আকুলতা, তা পাঠককে কাঁদিয়ে ছাড়ে। খালার দেওয়া কুড়ি টাকার একটি ছেঁড়া নোট হাতে নিয়ে সে স্বপ্নে বিভোর থাকে একটি রঙিন চশমা এবং একটি বেলুনওয়ালা বাঁশির। মেলায় জিলাপি আর পুরির গন্ধ তার পেটের ক্ষুধাকে চাগিয়ে তোলে।
ক্ষুধার ঘোরে, খাবারের সুগন্ধে খেলনার বদলে খাবার কিনতে বাধ্য হওয়ার যে দৃশ্য, তা দরিদ্র ঘরের শিশুদের শৈশব হরণের এক অসামান্য চিত্র।
প্রতীক, রূপক ও ভাষাশৈলী কাজী লাবণ্য তার লেখায় বেশ কিছু শক্তিশালী প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করেছেন। প্রথমত, প্রকৃতির রুদ্ররোষ। ঝড়ের বর্ণনাটি উপন্যাসে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। ময়নার জীবনে দারিদ্র্য এবং শোষণ এমনিতেই এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের মতো।
দ্বিতীয়ত, সরকার বাড়ির গীত। বিয়ের অনুষ্ঠানে গীত গাওয়ার দৃশ্যটি সমাজের শ্রেণিবৈষম্যের এক চমৎকার চিত্র।
তৃতীয়ত, আমিনা পাগলি এবং হিন্দু মেয়ে খুকি। এই চরিত্র দুটি ময়নার বিশাল হৃদয়ের প্রতীক। ধর্মের বিভেদ ভুলে ময়না এই নিগৃহীত মানুষগুলোকে কাছে টেনে নেয়। রমজান মাসে আমিনা পাগলির ময়নার কাছে ইফতার করতে আসা প্রমাণ করে, মানবতার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নেই; ক্ষুধা ও ভালোবাসাই মানুষের আদিমতম ধর্ম।
উপন্যাসটির একটি অন্যতম প্রধান শক্তি এর ভাষা। লেখক কাজী লাবণ্যের জন্ম রংপুরে হওয়ায় তিনি সেই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাকে অত্যন্ত সাবলীল ও নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন।
‘মোর তো দোনোখানে ন্যারা হাত’, ‘আহাম্মক হয়া গেইনো বাহে’, ‘প্যাটের ভেতর আক্কশ খাওয়া ভোক’—এই জাতীয় সংলাপগুলো গ্রামীণ জনজীবনের একেবারে ভেতর থেকে উঠে আসা।
‘হাজারমুখী রোদসী’ কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বা কয়েকটি চরিত্রের গল্প নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশের প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষের গল্প।
বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য, ধর্মের নামে মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক শোষণ এবং এক অসহায় মায়ের অবিরাম সংগ্রাম—সব মিলিয়ে এটি একটি নিরেট জীবনমুখী আখ্যান। উপন্যাসের পরিসর ছোট হলেও এর আবেদন সুদূরপ্রসারী। চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ এবং সমকালীন সামাজিক সমস্যাগুলোর সাহসী উপস্থাপন গ্রন্থটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, যারা জীবনের প্রকৃত রুক্ষতা, প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার মর্মন্তুদ লড়াই এবং সমাজবাস্তবতার নিখাদ রূপ সাহিত্যের দর্পণে দেখতে চান, তাদের জন্য ‘হাজারমুখী রোদসী’ একটি অবশ্যপাঠ্য উপন্যাস। যন্ত্রণা ও যাপনের এই মহাকাব্য পাঠকের মননে দীর্ঘদিন দাগ কেটে থাকবে। বইয়ের নাম: হাজারমুখী রোদসী লেখক: কাজী লাবণ্য প্রকাশক: গ্রন্থিক প্রকাশন প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা ২০২৫ প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান মূল্য: ২৫০ টাকা