সাতসতেরো

শবে কদরের মর্যাদা ও আমল

আল্লাহ তাআলা যেসব অনন্য বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে সম্মানিত করেছেন তার একটি কদরের রাত, এমন সম্মানিত মাস অতীতের কোনো জাতিকে দান করা হয়নি। পবিত্র কোরআনে এই রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম ঘোষণা করা হয়েছে এবং মহানবী (সা.) রমজান মাসের শেষ দশকের প্রত্যেক রাতে এই রাত অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন।

পবিত্র কোরআনে এই রাতকে ‘লায়লাতুল কদর' বলা হয়েছে। তাফসিরবিদরা বলেন, আরবি ভাষায় কদর শব্দের অর্থ দুটি: ক. ভাগ্যলিপি, খ. মূল্য বা মূল্যায়ন। এই ক্ষেত্রে উভয় অর্থই প্রযোজ্য। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘কদরের রাতে উম্মুল কিতাবে (বার্ষিক ভাগ্যলিপি) ভালো, মন্দ, জীবিকা, জীবনকাল ইত্যাদি বিষয় যা এক বছরে সংঘটিত হবে তা লেখা হয়।' (তাফসিরুল বাসিত : ২০/৯৫)

উল্লিখিত বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, এই রাতে মানুষের এক বছরের ভাগ্যলিপি লিপিবদ্ধ হয়। সে কারণে এই রাতকে কদরের রাত বলা হয়। আবার মর্যাদার বিচারেও এই রাতকে কদরের রাত বলা যেতে পারে। কেননা এই রাতের মর্যাদ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, ‘কদরের রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।' (সুরা কদর, আয়াত : ৩)

আল কোরআনে কদরের রাত পবিত্র কোরআনে কদরের রাতের বিশেষ মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো, ১. কদর নামে সুরা: আল্লাহ কদর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা নাজিল করেছেন। পবিত্র কোরআনের ৯৭ নম্বর সুরার নাম কদর। ২. কোরআন নাজিলের রাত: প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, কদরের রাতে আল্লাহ লওহে মাহফুজ থেকে এক সঙ্গে পুরো কোরআন পৃথিবীর আসমানে অবতীর্ণ করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে।' (সুরা কদর, আয়াত : ১) ৩. হাজার মাসের চেয়ে উত্তম: পবিত্র কোরআনে এই রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, কদরের রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।' (সুরা কদর, আয়াত : ৩) ৪. ফেরেশতা নাজিলের রাত: মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেই রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে।' (সুরা কদর, আয়াত : ৪) ৫. শান্তি নাজিলের রাত: কদরের রাত সম্পর্কে মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘শান্তিই শান্তি, সেই রাতে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।' (সুরা কদর, আয়াত : ৫) ৬. বরকতময় রাত: আল্লাহ অন্য আয়াতে এই রাতকে বরকময় বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআনকে বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি।' (সুরা দুখান, আয়াত: ৩)

হাদিসে কদরের রাত পবিত্র কোরআনের মতো একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা কদরের রাতের মর্যাদা প্রমাণিত হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সাওয়াবের আশায় কদরের রাতে জাগ্রত থাকবে (ইবাদত করবে) তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করা হবে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭৬৮) অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই যে মাস (রমজান) তোমরা লাভ করেছ তাতে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি তার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। আর হতভাগ্য ব্যক্তিই কেবল তার কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হয়।' (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬৩৪)

কদরের রাতের আমল মহিমান্বিত কদরের রাতে মুমিন বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যেকোনো আমল বা ইবাদত করতে পারে। তবে হাদিসে তিনটি আমলের ব্যাপারে তাগিদ পাওয়া যায়। তা হলো,  ১. নফল নামাজ: কদরের রাতে মুমিন অধিক পরিমাণে নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদ আদায়ের চষ্টো করবে। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সাওয়াবের আশায় কদরের রাতে জাগ্রত থাকবে (ইবাদত করবে) তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করা হবে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭৬৮) ২. ক্ষমা চাওয়া: আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি জানতে পারি লায়লাতুল কদর কোনটি তাহলে আমি সে রাতে কি বলব? তিনি বলেন, তুমি বলো, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়ুন কারিমুন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি। অর্থ : হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল দয়ালু, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩) ৩. তিলাওয়াত করা: বুজুর্গ আলেমরা বলেন, কদরের রাতে যেহেতু আল্লাহ কোরআন নাজিল করেছিলেন, তাই এই রাতে কোরআন তিলাওয়াতের বিশেষ মর্যাদা ও তাত্পর্য রয়েছে।

কদরের রাত যেভাবে চিনব বেশির ভাগ আলেমরা বলেন, ২৭ রমজানের রাতটি কদরের রাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে রাতটি যেহেতু আল্লাহর নবী (সা.) সুনির্দষ্টি করেননি, তাই কোনো রাতকে কদরের জন্য নির্দষ্টি করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, ‘তোমরা শেষ দশকে কদরের রাত অনুসন্ধান করো।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২০)

পূর্ববর্তী আলেমরা হাদিসের আলোকে কদরের রাতের বেশ কিছু নিদর্শন উল্লেখ করেছেন। যেমন, ১. বেজোড় রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৭) ২. কদরের রাতে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৮) ৩. কদরের দিনটি শুরু হয় প্রজ্জ্বল সূর্যালোর মাধ্যমে, কিন্তু তাতে প্রখরতা থাকে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬২) ৪. কদরের রাত হবে মনোরম ও  নাতিশীতোষ্ণ, যা না হবে গরম, না হবে ঠান্ডা। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস : ২১৯২)

আল্লাহ সবাইকে কদরের রাতের বরকত ও কল্যাণ দান করুন। আমিন।