সাতসতেরো

সদকাতুল ফিতর আদায়ের নিয়ম

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত সদকাতুল ফিতর। আল্লাহ তাআলা রমজান মাসে হয়ে যাওয়া ভুল-ত্রুটির প্রতিবিধান এবং দুস্থ ও আসহায় মানুষের আর্থিক সংস্থানের জন্য এই বিধান দান করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদকাতুল ফিতর রোজাকে বেহুদা ও অশ্লীল কথাবার্তা ও আচরণ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে এবং মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি তা (ঈদুল ফিতরের) নামাজের পরে পরিশোধ করে তা অন্যান্য সাধারণ দান-খয়রাতের অনুরূপ হিসাবে গণ্য। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)

সাদকাতুল ফিতর এমন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর ওয়াজিব যার হাতে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু ছাড়াও অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে। 

জাকাত ফরজ হয় না এমন ব্যক্তির ওপর সদকাতুল ফিতর ফরজ হতে পারে। কেননা জাকাত ও সদকাতুল ফিতরের নিসাবের মধ্যে পার্থক্য আছে। জাকাত শুধু সোনা-রুপা টাকা-পয়সা এবং ব্যবসার পণ্যের ওপরই ফরজ হয়। আর সদকাতুল ফিতর প্রয়োজন অতিরিক্ত সব ধরনের সম্পদের ওপর ওয়াজিব হয়। 

ব্যক্তি সদকাতুল ফিতর নিজের পক্ষ থেকে এবং তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে আদায় করবে। স্বামীর জন্য স্ত্রীর এবং প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে বাবার সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়। তারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে নিজেরাই আদায় করবে। তবে স্বামী ও পিতা আদায় করে দিলে আদায় হবে যাবে। 

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন। এর পরিমাণ হলো, এক সা জব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটি ওয়াজিব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫১২; ফাতহুল কাদির : ২/২৮১) 

এমনকি পবিত্র রমজানের শেষ দিনেও যে নবজাতক দুনিয়ায় এসেছে কিংবা যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করা আবশ্যক। (ফাতাওয়া আলমগিরি : ১/১৯২)

সদকাতুল ফিতর আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে। তবে রমজানের শেষ দশকে বা দু-তিন দিন আগেও আদায় করা যায় যেন দরিদ্ররা কেনাকাটা করতে পারে। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে দিতে না পারেন, তবে পরে হলেও তা আদায় করতে হবে, কারণ এটি একটি ওয়াজিব হক। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫০৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৬)

অনেকে মনে করেন খাদ্যদ্রব্য ছাড়া টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েজ নেই। অথচ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের আমল দ্বারা এটি প্রমাণিত। বিশিষ্ট তাবেয়ি আবু ইসহাক সাবেয়ি (রহ.) বলেন, আমি সাহাবায়ে কেরামকে খাবারের সমমূল্যের দিরহাম দিয়ে ফিতরা দিতে দেখেছি। খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) পত্রে লিখেছিলেন আধা সা গম বা তার সমমূল্য আধা দিরহাম আদায় করতে। বর্তমান যুগে দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণে টাকার উপযোগিতা বেশি হওয়ায় ফকিহরা একে উত্তম বলেছেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ১০৩১৭; আদ্দুররুল মুখতার : ২/৩৬৬)

সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, সবাই কেবল গমের সর্বনিম্ন হার অনুযায়ী ফিতরা আদায় করেন। প্রকৃতপক্ষে, যার সামর্থ আছে তার উচিত কিসমিস, খেজুর বা পনিরের মূল্য অনুযায়ী ফিতরা দেওয়া। ফিতরা পাওয়ার হকদার কেবল অভাবী মুসলমান। আত্মীয়দের মধ্যে যারা অভাবী (যেমন ভাই, বোন, চাচা, ফুফু) তাদের দেওয়া সবচেয়ে উত্তম, এতে সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, উভয় সওয়াব পাওয়া যায়। অমুসলিমদের ফিতরা দেওয়া জায়েজ নয়। নিজের ঊর্ধ্বতন (পিতা-মাতা, দাদা-দাদি) এবং নিজের অধস্তন  (ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি) এবং স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ফিতরা দেওয়া বৈধ নয়।

বাড়ির কাজের লোক যদি অভাবী হয় তবে তাকে ফিতরা দেওয়া যাবে, তবে শর্ত হলো এটি তার পারিশ্রমিক বা বোনাস হিসেবে দেওয়া যাবে না। ফিতরা দিতে হবে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। এছাড়া মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, রাস্তাঘাট বা জনকল্যাণমূলক কাজে ফিতরা ব্যয় করলে ফিতরা আদায় হবে না। (রদ্দুল মুহতার : ২/২৫৮)

বর্তমানে অনেক প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করে স্বদেশে ফিতরা আদায় করতে চান। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা হলো, ফিতরা আদায়কারী ব্যক্তি যেখানে অবস্থান করবেন, সেখানকার দ্রব্যমূল্যই হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ, একজন প্রবাসী যদি সৌদি আরবে থাকেন এবং বাংলাদেশে তার ফিতরা আদায় করতে চান, তবে তাকে সৌদি আরবের সর্বনিম্ন ফিতরার হার অনুযায়ী টাকা পাঠাতে হবে। তবে কেউ যদি তার পক্ষ থেকে দেশে সদকাতুল ফিতর আদায় করে, তবে নিজ দেশের নির্ধারিত খাদ্যের মূল্য অনুসারে সদকাতুল ফিতর আদায় করবেন। (আল-বাহরুর রায়িক : ২/৩৫৫)

আল্লাহ সবাইকে যথাযথভাবে সদকাতুল ফিতর আদায়ের তাওফিক দিন। আমিন।