সাতসতেরো

রমজানে ওমরাহ করলে হজের সওয়াব

মহিমান্বিত মাস রমজানে আল্লাহ বান্দার আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করেন। মুমিন এই মাসে অধিক পরিমাণে ইবাদত করার চষ্টো করে। হাদিসে রমজানে যেসব ইবাদত করার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে ওমরাহ তার অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক আনসারি নারীকে বলেছিলেন, ‘রমজান মাসে একটি ওমরা আদায় করা একটি হজের সমতুল্য।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৬৩)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আমার সঙ্গে একটি হজ আদায় করার সমতুল্য।’ নিঃসন্দেহে হাদিসের এই বর্ণনা রমজান মাসে ওমরাহ করার গুরুত্ব প্রমাণ করে। ফকিহ আলেমরা বলেন, এখানে হজের সমতুল্য হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্যে সাওয়াবের দিক থেকে সমান হওয়া বা ওমরাহর সওয়াব বৃদ্ধি করা। রমজানের ওমরাহ ফরজ হজের বিকল্প বা সমান হওয়া উদ্দেশ্য নয়। ফলে কেউ রমজান মাসে ওমরাহ করলে সে বিপুল পরিমাণ সওয়াব পেলেও ফরজ হজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পায় না। (শরহু সহিহ মুসলিম : ৯/২)

বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) বলেন, ‘রমজানের ওমরাহ হজের সমান’ কথার ব্যাখ্যা হলো, ওমরাহর ওপর হজের শ্রেষ্ঠত্বের দিক হলো হজে আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁর রহমত লাভের সমন্বয় ঘটে। রমজানে ওমরাহ করলে এই বৈশিষ্ট্য অর্জিত হয়। কেননা রমজান হলো আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হওয়ার সময়।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ : ২/৮৯)

জীবনের বাস্তবতায় দেখা যায়, সময় কোনো জিনিসের মূল্য যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমন সময় গেলে অনেক কিছুই মূল্যহীন হয়ে যায়। রমজান মাসের মূল্য ও মর্যাদা অসংখ্য বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাস এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৯৯)

যেহেতু রমজান একটি বরকতময় মাস, তাই রমজানে করা ইবাদতগুলোর মর্যাদা ও মূল্য বৃদ্ধি পায়। এই কারণে রমজান মাসে ওমরাহর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত হয় মক্কা-মদিনার মতো পবিত্র স্থানের মহিমা। অর্থাৎ রমজান মাসে ওমরাহ পালনকারী একইসঙ্গে স্থান, সময় ও কাজের বরকত লাভ করে থাকে।

রমজান মাসে সিয়াম সাধনার সঙ্গে ওমরাহর একটি বৈশষ্ট্যিগত মিল আছে। তা হলো, পাপমার্জনা ও আল্লাহর ক্ষমা লাভ। রমজান মাস সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮)

অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘এক ওমরাহর পর আরেক ওমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা (গুনাহের প্রতিবিধান) স্বরূপ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩)। অতএব কেউ রোজা রেখে ওমরাহ করলে ব্যক্তি একইসঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা লাভের দুটি উপলক্ষ লাভ করে। 

মুসলমান মাত্রই পবিত্র মক্কা ও মদিনার প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও আকর্ষণ লালন করে থাকে। কিন্তু আর্থিক সামর্থের অভাবে বহু মুসলমান হজ করার সুযোগ পায় না। তাদের হৃদয়ের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হতে পারে রমজান মাসে ওমরাহ করার মাধ্যমে। উম্মে সিনান (রা.) আর্থিক সামর্থের অভাবে হজ করতে না পারলে মহানবী (সা.) তাঁকে রমজান মাসে ওমরাহ করার পরামর্শ দেন। প্রাজ্ঞ আলেমরা এই ঘটনার আলোকে বলেন, ‘এটি উম্মতের জন্য একটি বড় সান্ত্বনা। যে ব্যক্তি কোনো কারণে হজে যেতে পারে না, তিনি রমজানে ওমরাহর মাধ্যমে বিশাল সওয়াব অর্জন করতে পারে।’ (ফাতহুল বারি : ৩/৬০৫)

আলেমরা রমজান মাসে ওমরাহ আদায়কে অধিক মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার পক্ষে একাধিক যুক্তি তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, রমজান মাসে ওমরাহ করলে ব্যক্তি বেশ কয়েকটি মর্যাদাকর দিক অর্জন করে। যেমন: ১. রোজা রাখার সওয়াব ২. ওমরাহর সওয়াব ৩. মক্কা ও মদিনায় ইবাদত করার সওয়াব ৪. দোয়া কবুলের স্থানে ও দোয়া কবুলের বিশেষ সময়ে দোয়া করার সুযোগ ৫. জমজমের পানি দ্বারা ইফতার ও সাহরি করার সুযোগ ৬. নবীজি (সা.) যেখানে ইতিকাফ করেছেন সেখানে ইতিকাফ করার সুযোগ, ইত্যাদি।

সাহাবায়ে কেরাম (রা.), তাবেয়ি ও তাদের পরবর্তী যুগের বুজুর্গ আলেমরা সুযোগ পেলে রমজান মাসে ওমরাহ আদায় করতেন এবং অন্যদের উৎসাহিত করতেন। তাদের মধ্যে সাঈদ ইবনে জুবায়ের, মুজাহিদ, আতা ও আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান (রহ.) প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। (তারিখে আবু জুরআ, পৃষ্ঠা ৩১৪)

সুতরাং রমজান মাসে যাদের ওমরাহ করার সামর্থ আছে তাদের উচিত ওমরাহ আদায় করা। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন।