সাতসতেরো

চাঁদ রাত ও ঈদের দিনের সুন্নত

মুসলিম জাতির সর্ববৃহৎ আনন্দ উৎসব ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর আসে খুশির ঈদ। বিশ্বের মুসলমানরা এই দিন ঈদ উদযাপন করেন। তবে মুসলমানের ঈদ নিছক আনন্দ উৎসব নয়, বরং এর মাঝে নিহিত আছে আল্লাহর আনুগত্য, রাসুলের অনুসরণ, পারিবারিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। ঈদের সামগ্রিক শিক্ষার প্রতিফলন তখনই ঘটে যখন তা মহানবী (সা.)-এর সুন্নত অনুসারে উদযাপন করা হয়। 

ঈদের তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য প্রথমে জানা প্রয়োজন ঈদের দিন কেন আনন্দের? হাদিসের ভাষ্য অনুসারে এই দিনে আল্লাহ রোজাদারদের পুরস্কৃত করেন। মুমিন দীর্ঘ এক মাস আল্লাহর যে পুরস্কারের আশায় রোজা পালন করে ঈদের দিন আল্লাহ তা প্রদান করেন। বিষয়টি সারা মাস কঠোর পরিশ্রম করার পর মুনিবের পক্ষ থেকে পারিশ্রমিক ও পুরস্কার লাভ করার মতো। 

হাদিসে এসেছে, ‌‘রোজাদারগণ আশা করে ঈদুল ফিতরের দিন তাদের ক্ষমা করা হবে। আর ঈদের দিনকে বলা হয় পুরস্কারেরও দিন।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ, হাদিস : ৩৭৩)

উল্লিখিত হাদিস থেকে জানা যায়, ঈদের দিন হলো মুমিনের ক্ষমা ও পুরস্কার লাভের দিন। এখন বিবেককে প্রশ্ন করতে হবে, আল্লাহর অবাধ্য হয়ে এবং ইসলামী শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করে কীভাবে ক্ষমা ও পুরস্কারের আশা করা যায়? বুজুর্গ আলেমরা বলেন, রাজা-বাদশাহর দরবার থেকে পুরস্কার লাভ করতে হলে ব্যক্তিকে যেমন রাজ দরবারের নিয়ম নীতি মেনে উপস্থিত হতে হয়, রমজানের সিয়াম সাধনার পর পুরস্কার লাভের জন্যও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিয়ম-নীতি মেনে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে হয়। তাই ঈদ উদযাপনের সুন্নত পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।

ঈদের রাতের সুন্নত

আলেমরা ঈদের রাতে দুটি আমলের কথা বলেন।  ১. নতুন চাঁদ দেখা ও দোয়া পড়া। তালহা বিন উবায়দুল্লাহ (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) নতুন চাঁদ দেখলে দোয়াটি পাঠ করতেন, উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল ইয়ুমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম; রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ। অর্থ: হে আল্লাহ! এই চাঁদকে ঈমান ও নিরাপত্তা, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন। আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫২৬)

২. ঈদের রাতে নফল নামাজ পড়া। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির লাভের জন্য দুই ঈদের রাত জেগে ইবাদতে মাশগুল হবে, কিয়ামতের কঠিনের দিনেও তার অন্তর মরবে না, যেদিন ভয়ংকর ও বিভীষিকাময় পরিস্থতির কারণে মানুষের অন্তর মারা যাবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৮২)

ঈদের দিনের সুন্নত

ঈদুল ফিতরের দিনের সুন্নত আমলগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো। ১. ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করার আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করা।  ২. ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করা। ৩. মিসওয়া করা। ৪. উত্তম পোশাক পরিধান করা। ৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ৬. ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে কিছু খেয়ে যাওয়া, সেটা মষ্টিান্ন হওয়া উত্তম।  ৭. ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়া। ঈদগাহের ব্যবস্থা না থাকলে মসজিদেও ঈদের নামাজ আদায়ের সুযোগ আছে। ৮. এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরা।  ৯. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। ১০. তাকবির পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া। ১১. পরস্পরকে ঈদের শুভেচ্ছা বা মোবারকবাদ জানানো। ১২. কথা ও কাজে ঈদের খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা। ১৩. সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের আপ্যায়ন করা। ১৪. সদকাতুল ফিতরের বাইরে কিছু নফল দান করা। ১৫. ঈদগাহ থেকে ফিরে নফল নামাজ পড়া।

ঈদের দিন যা বর্জনীয়

আলেমগণ ঈদের দিন কিছু কাজ পরিহার করতে বলেন। তা হলো:  ১. যে কোনো পাপ : ঈদের দিন যে কোনো পাপ কাজ থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। বিশেষ করে ইসলামে অনুমোদিত নয় এমন গানবাদ্য, পর্দা উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হারাম ও অশালীন বিনোদন পরিহার করা। ২. অর্থ ও খাদ্যের অপচয় : ঈদের দিন আনন্দ উৎসবের নামে অনেক সময় অর্থ ও খাদ্যের অপচয় হয়। যা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। যদি খাবার বেশি হয় তবে প্রতিবেশী ও অভাবী মানুষের ভেতর বণ্টন করা যেতে পারে।  ৩. নামাজ কাজা : ঈদের দিন আনন্দের স্রোতে ভেসে অনেকের নামাজ কাজা হয়ে যায়। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ৪. রোজা রাখা : ঈদের দিন রোজা রাখা শরিয়তে নিষদ্ধি বা হারাম। এই দিন রোজা রাখা যাবে না। 

আল্লাহ সবাইকে যথাযথভাবে ঈদ উদযাপনের তাওফিক দিন। আমিন।