সাতসতেরো

রোদন ও আগুনের অক্ষর: যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনাগাথা

একাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে বড় হয়েছি ‘একাত্তরে আমাদের দেশকে হানাদারমুক্ত করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা’, এ-ই শুনে। বড় হয়ে ইতিহাস খুঁড়ে বেদনা মন্থন করে জেনেছি, এই হানাদার বাহিনী ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রটির একাত্তরকালীন শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সেনাবাহিনী। জেনেছি, এদেশের কিছু মানুষ মীরজাফর হয়ে হাত মিলিয়ে ছিল বলেই হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলার বৃষ্টি-বন্যার বাধা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জান বাজি রাখা প্রতিরোধের মধ্যেও বাড়ি চিনে চিনে হামলা করেছে। শিশুদেরকে বেয়োনেটবিদ্ধ করেছে। নির্বিচারে গণহত্যা করেছে। বৃদ্ধা থেকে কন্যাশিশুও রেহাই পায়নি বর্বরদের ভয়াবহতম যৌন নির্যাতন থেকে। 

আমরা পরিবার থেকে ইতিহাস জ্ঞান লাভ করেছি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং বিপক্ষের মত গ্রহণ করেছি বাবা-মা-গুরুজনদের কাছ থেকে। এর পাশাপাশি পুরনো পত্র-পত্রিকা, বই পড়ে যা বুঝেছি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সব রকমের তথ্য ও বর্ণনায় নারীর অবস্থান খুব সামান্য। রণাঙ্গণের অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা নারীর সংখ্যার বর্ণনায় উত্তেজনা কম। ‘মুক্তিযুদ্ধে ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন’- এটুকু বলেই নারীর অবদান স্বীকারের দায় শোধ করা হয়ে যায়। এতটা সহজ ‘সম্ভ্রম’ হারানো! না। সহজ নয়। তাইতো মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরী থাকা আমার মা’কে প্রশ্ন করে বুঝেছি, নারী কিসের ভেতর দিয়ে গিয়েছিলেন সেটা বলা সহজ নয়।  আসলেই সহজ নয়। ফলতঃ এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি অংশকে বাংলাদেশের জন্মের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানাতে ব্যর্থ হয়েছি। শিশু-কিশোর-তরুণদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলতে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে লেখা অনেক আছে। সেই তুলনায় বীরাঙ্গনা আর যুদ্ধশিশুদের নিয়ে লেখা হয়নি বললে ভুল হবে না। ধর্ম-শ্রেণি নির্বিশেষে এ দেশের শিশু, কিশোরী ও নারীদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের জঘন্যতম অত্যাচারের সুস্পষ্ট বর্ণনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শিশু-কিশোর-তরুণদের জন্য গল্প লিখেছি নিজেও। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কয়েক বছর আগে একটি টিভি নাটক লিখেছিলাম। বড়রা দর্শক, কাজেই চাপ ছিল না। কিন্তু ফাল্গুনী তানিয়া যখন কিশোর-তরুণদের উপযোগী করে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের নিয়ে লেখা গল্পের সংকলন করছেন বলে গল্প চাইলেন, তখন চাপ অনুভব করেছি। একই সাথে এতকাল যে লিখিনি, তার জন্য অপরাধবোধে বিদ্ধ হয়েছি। আর লিখতে বসে বারবার হাল ছেড়ে দিয়ে ভেবেছি, পারব না। মুক্তিযুদ্ধের গল্প লিখতে আমি সব সময় সত্য ঘটনাকে আশ্রয় করে ভাবতে চাই। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে সত্য ঘটনাগুলো এতটা সত্য, সে সময়ের মানুষরা যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন তা এতটাই স্পর্শযোগ্য যে কল্পনার ঘোড়া ছোটানোর দরকার পড়ে না। বীরাঙ্গনার গল্প লিখতেও সত্য ঘটনাকে বেছে নিয়েছিলাম। নারীর শরীরকে যুদ্ধাস্ত্র বানানোর বর্বরতম ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত কল্পনায় আনতে গিয়ে মাথার ভেতর আগুন ধরে যেত। একটা সময় মনে হতো, সে নারী আমিই। আমার সাথেই ঘটছে প্রতিটি দাড়ি, কমা। আমি শুনতে পাচ্ছি বুটের আওয়াজ, কুৎসিত হাসি। আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার সামনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কেবলি বর্তমান যা কদর্য, যন্ত্রণাদায়ক। তাই বারবার লেখায় ইতি টেনেছি। ফাল্গুনী তানিয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মত যুদ্ধজয়ের শক্তি জোগাতেন বলে শেষ হয়েছিল গল্পটা। 

হাল ছেড়ো না বন্ধু! এই আপ্তবাক্য উচ্চারণ করে আঠারোসম কিশোর ও তরুণদের উপযোগী করে গল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের অবদানকে তুলে ধরে প্রকাশিত হ’ল গল্পগ্রন্থ রোদন ও আগুনের অক্ষর: যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনাগাথা। ৫৬০ পৃষ্ঠার এই গল্পগ্রন্থে আছে ৪৫ জন লেখকের লেখা ৪৫টি গল্প। সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন ফাল্গুনী তানিয়া। উৎসর্গপত্রটি বেদনার ভারবাহী যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ সেই নারীদের, যাঁদের শরীর ও সত্ত্বা একসঙ্গে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সেই বীরঙ্গনাদের এবং সেই যুদ্ধশিশুদের, যাঁদের জন্ম যুদ্ধের আগুন ও মায়েদের রোদনের ভিতর থেকে, যাঁদের প্রথম কান্নার সঙ্গেই এই ভূমির ইতিহাস মিশে আছে।” প্রতিটি গল্প একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ শিশুদের সাথে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও তাদের  দোসর এদেশের রাজাকারদের করা নির্মম অত্যাচারের ইতিহাস এবং তাদের অদম্য জীবনযুদ্ধকে তুলে এনেছে। বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রচ্ছদ। বিষন্ন অথচ সাহসী নারীর মুখাবয়বে উঁকি দিচ্ছে “বন্দী শিবির”, প্রতি সন্ধ্যায়’ চার-পাঁচটি তরুণীকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হতো”-এরকম বীভৎস সংবাদের টুকরো। নির্ঝর নৈঃশব্দ্য করেছেন হৃদয়গ্রাহী প্রচ্ছদটি।

ক্রমশঃ স্বাভাবিক হয়ে পড়ছে নারীর প্রতি পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ যৌন নির্যাতন, যেন নারী বলেই নারীর সাথে এমন ঘটবে। এই স্বাভাবিকতাকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি নিজেদের পাপ ঢাকতে ক্রমশঃ যে আখ্যান আমাদের সামনে হাজির করছে, তা হ’ল মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীর সম্ভ্রম হারানো নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। ক্রমশঃ হাজির হচ্ছে ‘কথা বলার কিছু নেই’,  ‘তেমন কিছু না’, ‘ভুল বোঝাবুঝি’ জাতীয় প্রক্রিয়াজাত প্রপাগান্ডা। একে আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। এর বিপরীতে সত্যের সত্য রূপকে ঢাল হিসেবে তুলে নিতে হবে। যুদ্ধশিশু বিষয়ক গবেষক সাজিদ হোসেন এই গল্পগ্রন্থের ভুমিকাতে ’৭১ এ নারীদের উপর নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। ধর্ষিত নারীদের সংখ্যা বিচারে এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ হয়েছিল। ধর্ষণের শতকরা হার বিচারে মুসলিম নারীরা সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। যুদ্ধ শিশুদের সংখ্যা কত ছিল, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ শিশুদের পুনর্বাসনে বাংলাদেশ সরকার এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা কীভাবে এগিয়ে এসেছিলেন, এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজেছেন তথ্যসূত্রের মাধ্যমে। তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে কিন্তু বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ শিশুদের জীবনের গল্প অনুধাবন দুঃসাধ্য। একালে আমাদের অনুভূতিও বিশেষভাবে ভোঁতা। এতসব প্রেক্ষাপটে সেই সব জীবনের গল্প বলার চেষ্টা আসলেই ছিল জরুরি। 

যেসব সচেতন অভিভাবক চান সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানাতে, অথচ ভাবছেন নারীর উপর যৌন নির্যাতনের বর্ণনা শিশুকিশোরদের সামনে কীভাবে করবেন, তাদের জানাতে চাই, আপনার সন্তানের হাতে তুলে দিন বইটি। ওরা জানুক, বীরাঙ্গনারা অজানা অচেনা কেউ নন। আমাদের কারোর দাদি, কারোর নানি, কারোর খালা, কারোর মা, কারোর বোন, কারোর মেয়ে। গল্পের মধ্য দিয়ে ওরা জানুক, পাকিস্তানীদের হাতে অন্যের মেয়েদের তুলে দিত, এমন রাজাকার-আলবদরদের মেয়েও রেহাই পায়নি। নিজের মেয়েকে নির্যাতিত হতে দেখে সেই বাপ আর সহ্য করতে না পেরে মেয়েকে নিয়ে পালায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়লে মেয়েই চেয়েছিল বাপের মৃত্যু হোক। নীল রঙে আকাশ আঁকতে ভালোবাসে যে কিশোর, সে জানুক পাকিস্তানী ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় নীলার পরনে ছিল নীল শাড়ি! 

গল্পগুলো এক নাগাড়ে পড়া যায় না। প্রতিটি গল্প স্তব্ধ করে দেয়, বুকের ভেতর কান্না জমে, চোখে জ্বলে ওঠে আগুন। এরকম এক আগুনের গল্পে ধর্ষিতা হতে যাওয়া নিজের মায়ের আর্তচিৎকার শুনেছিল যে সেলিম, তার সাথে সাথে মন্ত্রধ্বণির মতো জপ করতে ইচ্ছে হয়... মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন... ওমা আমি নয়ন জলে ভাসি! আরেকটি গল্পে নানির লাশের গোসল দিতে গিয়ে মায়মুনার অবাক চোখে নানির কর্তিত বুকের দিকে চেয়ে থাকার বর্ণনা বীরাঙ্গণাদের কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল তা অনুভব করতে শেখায়। এরপর মনের ভেতর জাগে প্রতিশোধের স্পৃহা আর গল্পে যখন পড়ি, এক পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা একাত্তরে যে নারীকে অত্যাচার করেছিল, বহু বছর পর সেই নারীর সন্তান যুদ্ধশিশু প্রতিশোধ নেয় অথবা আরেক গল্পে বীরাঙ্গনা প্রতিরোধে হয়ে ওঠেন ‘চামুন্ডা’, তখন পাঠক হিসেবে অদ্ভুত শান্তি পাই। 

ফাল্গুনী তানিয়া সম্পাদনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে একটি জরুরী প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। এই বাংলাদেশে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের উদ্দেশ্যে একটি সৌধ নির্মাণ করা উচিত। লেখকদের পাশাপাশি পাঠকরাও এ দাবিতে সোচ্চার হলে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধ শিশুদেরকে পবিত্র নারী ও শিশু হিসেবে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজ অনেকদূর এগিয়ে যায়। কেনো নয় সৌধ? আদনান সৈয়দ এর লেখা গল্প ‘দাদির নীল স্যুটকেস’ এর দাদি, নীল স্যুটকেসে পাওয়া দাদির ডায়রিতে লেখা দাদির জীবনে ঘটে যাওয়া অবর্ণনীয় কষ্টের অভিজ্ঞতা এবং গল্পের শেষের লাইন ‘দাদির নীল স্যুটকেসটাই এখন আমার এক চিলতে বাংলাদেশ’ মনের ভেতর সৌধ গড়ে তোলে বৈকি।

পরিবার পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত রোদন ও আগুনের অক্ষর: যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনাগাথা নামের অসামান্য এই গল্পগ্রন্থের দাম বারো’শ টাকা। মুদ্রণ এবং বাঁধাই উন্নত মানের। ছাপার ভুল একদম নেই বললেই চলে। হাতে নিতেই চোখ বোলাতে ইচ্ছে হয়। উপহার দিয়েছিলাম কয়েকজনকে। এক কিশোর মাত্র দু’টো গল্প পড়েই একগাদা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিল। সম্প্রতি ঝড় তোলা টপিক এপস্টিন ফাইলস নিয়ে জানাশোনা আছে তার। নিজের দেশে, নিজের পূর্বনারীদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ওর কাছে মনে হয়েছে এপস্টিন ফাইলস এর চেয়েও অনেক বেশি ব্যাপক।

আরেকজন পাঠক, যিনি নিজে বীর মুক্তিযোদ্ধা, গল্পগুলো পড়ে ফিরে গিয়েছিলেন একাত্তরের স্মৃতিতে। যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধারা হলেন বীর আর যুদ্ধফেরত বীরাঙ্গনারা হলেন অস্পৃশ্য, সমাজচ্যুত। বীরাঙ্গনাদের নিজের তো বটেই, যুদ্ধশিশুদের, এমনকি বীরাঙ্গনার অন্য সন্তান, তাদের সন্তানদেরও সমাজের ঘৃণা নিয়ে লড়তে হয়েছে। লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, এমন কয়েকজনের কথা বললেন তিনি।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে আমার কন্যা। মায়ের গল্প পড়েছিল ছাপার আগেই। গল্পগ্রন্থটি হাতে পেয়ে অন্য গল্পগুলো পড়ছে। বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের কষ্ট ও আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে রোদন ও আগুনের অক্ষর: যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনাগাথা এর অনুবাদ দরকার বেশ কয়েকটি ভাষায়, এ-ই ছিল ওর মতামত। আশার কথা, ফাল্গুনী তানিয়া ইংরেজিতে গল্পগুলো প্রকাশের কাজ শুরু করেছেন। এর পাশাপাশি অডিও বুক, ই-বুক আকারেও আসবে গল্পগুলো। সময়ের প্রয়োজনে নতুন প্রজন্মকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে যে মহতী উদ্যোগ ডানা মেলছে, এতে জেগে আছে লাখো মা-বোনের চরম আত্মদানের পবিত্র স্মৃতি।  রোদন ও আগুনের অক্ষর: যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনাগাথা এর সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।