সাতসতেরো

নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের ‘সমুদ্রের দিকে’: প্রাপ্তমনস্কতার অভিনব ন্যারেটিভ

নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের সমুদ্রের দিকে  উপন্যাসে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, প্রেমনীতি আছে সমস্ত কিছুর বয়ান। লেখক এমন ন্যারেটিভ বেছে নিয়েছেন যেন স্যাটায়ার, উইট, ম্যাজিক রিয়ালিজম সব কিছু আষ্টেপৃষ্ঠে একত্রীভূত থাকে। একটি অস্থির সময়কে বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি যে বর্ণনারীতি ও চরিত্রসমূহ বেছে নিয়েছেন তা প্রশংসার দাবীদার। উপন্যাসের শুরুটিই পাঠককে টেনে ধরে রাখবার জন্য যথেষ্ট। তিনি ঢাকা শহরকে শহর বলেননি। বলেছেন শহরের কঙ্কাল। মানুষ আর পুলিশের মারামারির দৃশ্য স্পষ্টতই বুঝিয়ে দেয় উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণ হয়েছে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে।

এই উপন্যাসে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উত্থান দেশে যে অরাজকতা তৈরি করেছে তার প্রতীকী বর্ণনা পাঠককে প্রবল ভাবে নাড়া দেবে। কিশোর গ্যাং ঢাকা দখল করেছে। ঢাকাকে একটি দেশ ঘোষণা দিয়েছে। লেখকের এই উক্তির কারণ দেশের আপামর জনসাধারণের বিশেষ করে গ্রাম প্রধান বাংলাদেশের মানুষ এখানে অনুপস্থিত ছিল। আমাদের জাতীয়তাবাদের ওপর যে সব ধাক্কা এসেছে ক্রমাগত লেখক পাঠকের চোখে রঙিন চশমা লাগিয়ে দিয়েছেন তা উপভোগ করার জন্য। জাতির পিতা নায়ক মান্না। তার বিশাল সব বিলবোর্ড চারধারে। লাল রং স্যুট-টাই পরা, চোখে সবুজ সানগ্লাস। তার ছবির নিচে প্রেসিডেন্টের ছবি। প্রেসিডেন্ট একটা হ্যাংলাপাতলা কোঁকড়া চুলের কিশোর, পরনে মাইকেল জ্যাকসনের কস্টিউম। হাতে একটা কাটাবন্দুক। পায়ের কাছে একটা ছাগল। ঢাকা শহর যেন সিটি অব গোট। বয়ানের সবচেয়ে তীক্ষ্ম স্যাটায়ার বোঝা যায় যখন ঢাকার রাজধানী বলা হয় কামরাঙ্গীরচরকে। সংসদ ভবনকে গণশৌচাগার বলে অভিহিত করে তিনি যে চক্রের মধ্যে পাঠককে প্রবিষ্ট করেন তা ম্যাজিক রিয়ালিজম শুধু নয় দৃশ্যের বমন। যে বমন ঢাকা নগরীর বাসিন্দা নয় পুরো দেশকে আক্রান্ত করে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা আমাদেরকে ক্লেদাক্ত হতে হয়, ঘৃণায় শরীর রি রি করে তবু এই বাস্তবতা থেকে বের হতে না পারা মূলত দীর্ঘস্থায়ী আক্ষেপ তৈরি করে। ঔপন্যাসিকের দক্ষতা এখানেই যে তিনি যে পথ আামাদের পরিভ্রমণ করাতে চেয়েছেন সেই পথটি আমাদের চেনা কিন্তু তার মতো সুতীক্ষ তরবারির মতো ফালা ফালা করে কেটে অন্তর্গত রূপটিকে পাঠকের সামনে উপস্থিত করার দুঃসাহস সব লেখকের নেই। সব পাঠকও আয়নাবাজির এই খেলাতে নিচের চেহারাকে উদ্ভাসিত হতে দেখে তা মেনে নিতে পারবে না। সেদিক থেকে উপন্যাসটি প্রাপ্তমনস্কদের জন্যই।  অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও তার প্রশাসনের দেশ চালানোর দক্ষতাকে রূপকের মাধ্যমে বিদ্রুপাত্মকরূপে উপস্থাপন করেছেন ঔপন্যাসিক :

পাইলটের রুমে ঢুকে যা দেখলাম, তাতে আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। পাইলটের আসনে লুঙ্গি পরা, ধুমসি টাইপের একজন লোক বসে প্লেন চালাচ্ছে। তার মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটোতে কেমন একটা নেশাগ্রস্ত ভাব। সে গুনগুন করে একটা সিনেমার গান গাইছে। … 

আমার মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। পাইলট তার ট্রাক ড্রাইভার শালাকে প্লেন চালানোর দায়িত্ব দিয়ে বাসায় গিয়ে ঘুম যাচ্ছে। আর এই প্লেনটাকেও ট্রাকের মতোই রাস্তায় চালাচ্ছে।

 প্লেনটাকে ২০২৪ এর বাংলাদেশের রূপক ধরলে সবকিছু স্পষ্ট হয়। নিরাপত্তাহীনতা, মব কালচার, খুন, ধর্ষণ, নারীদের ধর্মের নামে হেনস্থা করা হেন বিষয় নেই যা এই উপন্যাসে নেই। নেশাগ্রস্থ প্রধান চরিত্রের কার্যকলাপ অনেক সময় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কমলাকান্তের কথা মনে হয়। হাস্যরসাত্নক রঙ্গব্যঙ্গমূলক ন্যারেটিভের ভিতর দিয়ে পরিহাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সমাজ, ধর্ম, সভ্যতা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতার তীব্র সমালোচনা করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। এ জন্য তিনি যে তীব্র ভাষা-ভঙ্গি বেছে নিয়েছেন তা সমাজকে চাবুকে বিদ্ধ করে। এমনকী শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গবিযুক্ত মোসাহেব শিল্পীদেরও লজ্জা হবে এই উপন্যাস পড়ে। যে নামগুলো তিনি বেছে নিয়েছেন সচেতন পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন তিনি বাস্তবের কোন চরিত্রকে কষাঘাত করেছেন। যেমন :

আজহার ঠাকুর নাকি একবার জার্মানি গিয়ে ছাগলের ওপর থিসিস করে এসেছিল। তার টপিক ছিল খুব সম্ভবত ‘ছাগলে কী না খায়, এই আপ্তবাক্য সত্য নয়, ছাগল সব কিছু খায় না যেমন তামাকপাতা, পলিথিন’ এই জাতীয় কিছু। দেশে ফিরে দেশের নানা জায়গায় বানিয়েছিল ছাগলের খামার। সেইসব খামার থেকেই বের হয়েছে পালে পালে বুদ্ধিজীব। দেশে তো অনেক আগে থেকেই বুদ্ধিজীবের বাম্পারফলন হয়। তবে এখনকার সঙ্গে পার্থক্য সামান্যই, এখনকার ফলন ডিজিটাল।

দর্শন এই উপন্যাসের কলেবরে বিস্তার ঘটিয়েছে অসংখ্য শাখা-প্রশাখাসহ। মাক্স, দেরিদা, গ্রামসির পাশাপাশি গালিব, ইকবাল প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তর লেখকের পাঠ পরিধি ও প্রাজ্ঞতার পরিচয়বাহী। অবিকশিত গণতন্ত্র নয় সমাজতন্ত্রের মধ্যেই তিনি মানুষের মুক্তি খুঁজেছেন। মুক্তি খুঁজেছেন শিল্প, সাহিত্য দর্শনের ভিতর। একটি অস্থির সময় থেকে বের হবার জন্য উট পাখির মতো নিজের ভিতরে মুখ না লুকিয়ে তিনি নিজেকে নিঃশেষ করেছেন প্রেমে ও প্রণয়ে। তবে আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী আমি সকল দাগে হব দাগী …

এ প্রেম তেমন নয়। মনোদৈহিক এ প্রেমে শরীরী বর্ণনা এসেছে অবিসংবাদিত রূপে। যেহেতু ঔপন্যাসিক বলেই দিয়েছেন এটি প্রাপ্তমনস্ক উপন্যাস। তাই পাঠকের এক রকম প্রস্তুতিও পড়ার আগেই তৈরি হয়ে যায়। এই বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্বভাবজাত ভাবেই খুঁজে ফিরেছি সেটা হলো লেখকের জেন্ডার সম্পর্কিত দৃষ্টিকোণ। নারীকে Sex Object করার প্রবণতা পুরুষ সাহিত্যিকরা নিজের অগোচরেই করে ফেলেন। সমরেশ বসুর প্রজাপতি  কিংবা বুদ্ধদেব বসুর রাত ভ’রে বৃষ্টি অশ্লীলতার দায়ে কাঠগড়ায় উঠেছে। সাহিত্যকে শ্লীল অশ্লীলের ভাগে দুষ্ট করতে আগ্রহী নই আমি। অক্ষরা ও লেখকের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটি আধুনিক, সময় উপযোগী ও দ্বিপাক্ষিক পরিণত একটি সম্পর্ক। পরিণত বলছি এ কারণে যে এখানে পরষ্পরকে নিবিড় ভাবে চাওয়ার চেয়ে উভয় তরফে আর কোনো প্রত্যাশা নেই। তবে এই প্রেম বর্ণনার ক্ষেত্রে লেখক যেভাবে বিদেশি সাহিত্যের প্রসঙ্গ টেনেছেন, মুভির কথা বলেছেন যেমন লেডি চ্যাটার্জিস লাভার তার চেয়ে আমার কাছে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়েছে বৈষ্ণব কবিতার সঙ্গে-

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে পরাণ পিরিতি লাগি থির নাহি বাঁধে।

অক্ষরার প্রতি প্রেমের যে নিবেদন এবং পূর্ণতাপ্রাপ্তি তা  ‘পুলকে পূরয়ে তনু শ্যাম-পরসঙ্গে’ অনুভবের সঙ্গে তুলনীয়। ‘সমুদ্রের দিকে’ যে যাত্রা যদি তাকে মানব-সমুদ্র-শরীর মন্থনের সঙ্গে তুলনা করা যায় তবে কালিদাসের সাহিত্যকেই বারবার স্মরণ করেছি আমি। আদিম প্রণয়ে মত্ত দুজন নারী-পুরুষ সঙ্গমসমাপ্তি ক্ষণেই মূলত মানব হয়ে ওঠে। আশ্লেষ আলিঙ্গনই তাদের প্রকৃত প্রেমের বার্তা বহন করে, নারী যেখানে রাণী। লেখক যদি বৈষ্ণব পদাবলী বা কুমারসম্ভব বা গীতগোবিন্দের উল্লেখ করতেন তবে বইটির ব্যপ্তি বাড়ত বলে মনে হয়েছে। যদিও শব্দচয়নে লেখক একবার উত্তরমেঘ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। প্রেম-প্রকৃতির কাব্যিক ভাষা চয়ন গীতল গদ্যের রূপে পাঠককে মোহাবিষ্ট করে। পাঠক কখনো গহীন জঙ্গল কখনো গভীর সমুদ্রে সাঁতরায়, অতল জলে পরিভ্রমণ করতে গিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হয়। নৈঃশব্দের কবিতা তার উপন্যাসকেও প্রভাবিত করেছে। প্রসঙ্গত একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করছি :

আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে দেখি দরজার পরে রোদের দিন, থই থই রোদের তলে শুয়ে হাওয়ায় দুলছে আকাশের প্রান্ত অবধি সূর্যমুখীর বন, যেন গাঢ় হলুদ সমুদ্র। আমি যেন বা ঝাপ দিয়ে সেই সমুদ্রে নেমে পড়ি। দুহাত দুপাশে পাখির ডানার মতো প্রসারিত করে সমুদ্রের বুক চিরে ছুটে যাই আকাশপাড়ে। আমার চুলে মুখে চোখে, নাকে সারা শরীরে লেগে যায় সূর্যমুখীর রেণু ও প্রেম। … 

নির্ঝরের কবিতায়ও ঘুরে ফিরে আসে নদী, সমুদ্র, মেঘ, কুয়াশা, সূর্যমুখীর বন, হিজল গাছ, বনের পর বন, পাহাড়ের পর পাহাড়, গাছের পর গাছ। জীবনানন্দ দাশের মতো তার নদীও ঘুরে ঘুরে কথা কয়। প্রকৃতি মানবস্পর্শে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আকাশ আর বনপাহাড়ের মধ্যে যে প্রেমকে তিনি খুঁজে ফেরেন তা একটুখানি জড়িয়ে থাকা থেকে আসঙ্গলিপ্সাতে পরিণত হয়। অক্ষরার সঙ্গে প্রেমের যে বিরহ তা সেই কোটি প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস- যে ভোলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে, আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।’ সেই বিরহ লেখকের নিজের কবিতাতেও উপস্থিত । যে চুম্বনকে উপন্যাসে অমরতা দিতে চেয়েছেন ঔপন্যাসিক মূলত বহু আগে থেকেই তা তাঁর কবিতাকে অধিকার করে আছে :

তুমি জেনেছিলে প্রতিবারই শেষবারের মতো তোমাকে চুমু  খাই। আর প্রতিবারই তোমাকে হারাই, মনে হয় আমাদের  রুদ্ধশ্বাস চুম্বনের ভিতর ফুরিয়ে যাক আমাদের নশ্বর শরীর আর  শ্যামল পাতাল, ফুরিয়ে যাক আরও যা আছে বাসনার সুতীব্র লাল। উনিশে এপ্রিল ০৬.০৯. ২২

সমুদ্রের দিকে উপন্যাসের শেষে যে প্রেমারতি, যে অবগুণ্ঠন, যে স্মৃতি-বিস্মৃতির আরোহন-অবরোহন তা ‘দশ মহাবিদ্যা’ কবিতার অণুরণন। যে বুভুক্ষু হৃদয় নিরাপত্তা খোঁজে পরিপার্শ্বের ভিতর তা বিলীয়মান সূর্যাস্তের মতো, সমুদ্রের দিকে এই যাত্রাপথ তাই প্রলম্বিত হতে থাকবে, এই যাত্রার শেষ নেই। পথ যে বন্ধনহীন গ্রন্থির সৃষ্টি করে চলতি হাওয়ার পন্থীরাও তার উদ্দেশ করতে পারে না। মানব-মানবীর এই যাত্রা তাই অন্তহীন :

রক্ত চিরে আরও রক্তের ভেতর ঢুকে যাও প্রিয় দুর্ণিবার, সমুদ্রের তৃষ্ণায় লম্বিত হও, প্রলম্বিত হও পৃথিবীর সকল অরণ্য, প্রান্তর আর জলাশয় ঘিরে, ঘূর্ণি হও মৃন্ময় রাত্রির অথির  গুহায়।…

সমুদ্রের দিকের এই যাত্রায় পাঠককে স্বাগতম …