গরমের দিনে এক স্কুপ আইসক্রিম—এই ছোট্ট আনন্দটাই যেন মুহূর্তে মন ভালো করে দেয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবার কাছেই প্রিয় এই ঠান্ডা মিষ্টি খাবার। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, আইসক্রিমের ‘বাড়ি’ কোথায়? এর জন্ম কোথায়, আর কীভাবে এটি আজকের বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠল?
আইসক্রিমের গল্প শুরু হয় এশিয়ায়, বিশেষ করে চীনে। বহু আগে চীনের মানুষ বরফের সঙ্গে দুধ ও মিষ্টি মিশিয়ে এক ধরনের ঠান্ডা খাবার তৈরি করত। এই ধারণাটিই ধীরে ধীরে আইসক্রিমের ভিত্তি গড়ে দেয়।
১৩শ শতকে ইতালির ভেনিসের এক তরুণ অভিযাত্রী মার্কো পোলো ভ্রমণ শেষে চীন থেকে দেশে ফেরেন। তিনি শুধু রেশম, মসলা বা গল্পই আনেননি, সঙ্গে এনেছিলেন এক নতুন খাবারের ধারণা—বরফে মিষ্টি মিশিয়ে তৈরি এক সুস্বাদু ঠান্ডা পদ। ইউরোপের মানুষ প্রথমে বিষয়টি অবিশ্বাস করলেও, পরে যখন তিনি তা বানিয়ে খাওয়ান, তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়।
তবে সেই সময় আইসক্রিম ছিল বিলাসবহুল খাবার। বরফ সংরক্ষণ কঠিন ছিল, আর তৈরির কৌশলও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে এটি রাজপ্রাসাদ আর অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ১৬৮৬ সালে। প্যারিসে ‘Francesco Procopio dei Coltelli’ খুলে ফেলেন বিশ্বের প্রথম আইসক্রিম পারলার—ক্যাফে প্রোকোপ। এখান থেকেই আইসক্রিম সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে শুরু করে। তার উদ্ভাবিত ইতালীয় জেলাটো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এরপর আইসক্রিম পাড়ি জমায় আমেরিকায়। জর্জ ওয়াশিংটন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এবং টমাস জেফারসন—এদের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিরাও ছিলেন আইসক্রিমপ্রেমী। বিশেষ করে জেফারসন ভ্যানিলা আইসক্রিমকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
১৯শ শতকে আইসক্রিম আরও সহজলভ্য হয়ে ওঠে কার্লো গাট্টির এর উদ্যোগে। তিনি লন্ডনে সস্তায় আইসক্রিম বিক্রি শুরু করেন, ফলে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আনন্দে পরিণত হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে আইসক্রিম আসে মোগলদের হাত ধরে। ‘কুলফি মালাই’ নামে পরিচিত এই খাবার মাটির হাঁড়িতে জমিয়ে তৈরি করা হতো। ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলে।
বাংলাদেশে আইসক্রিমের আধুনিক যাত্রা শুরু হয় পাকিস্তান আমলে। হাতে তৈরি আইসক্রিমের পাশাপাশি মেশিনে তৈরি আইসক্রিম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে ঈগলু-এর মতো প্রতিষ্ঠান এই শিল্পকে আরও বিস্তৃত করে।
আজকের দিনে আইসক্রিম শুধু একটি খাবার নয়, এটি আনন্দ, স্মৃতি আর সংস্কৃতির অংশ। এর জন্ম চীনে হলেও, ইতালির হাত ধরে ইউরোপে পরিচিতি পায়, আর সেখান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাই বলা যায়—আইসক্রিমের আসল বাড়ি এক জায়গায় নয়; এটি পুরো পৃথিবীরই একটি মিষ্টি সম্পদ।