প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থের বিবেচনায় মনি হায়দারের লেখালেখির বয়স ৩০। যদি ছাপার অক্ষরে প্রথম লেখা প্রকাশের হিসাব ধরি, তাহলে ৪০। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৬টি। প্রকাশিত ছোটগল্পের বই ৩২টি। সব মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ষাটের অধিক।
বর্তমান নিবন্ধে মনি হায়দারের মুক্তযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’ নিয়ে আলোচনা করবো। অনেকের অভিযোগ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপট এবং মুক্তির জন্য একটা জনগোষ্ঠীর যে অসীম ত্যাগ এবং সংগ্রাম, তার যথাযথ রূপায়ণ সাহিত্যে ঘটেনি।একথা আংশিক স্বীকার করে নিয়েও বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু কালোত্তীর্ণ সাহিত্য রচিত হয়েছে ।বাংলাদেশের প্রধান লেখকদের প্রায় সকলেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন। সেই ধারায় ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
ভাগীরথী নামের অতি সাধারণ এক নারীর ওপর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক অত্যাচারের মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে। সে একাত্তরে বাংলাদেশের অগণিত নির্যাতিতা নারীর প্রতিনিধি। সে পাক নরপশুদের অত্যাচার এবং পাশবিকতা সহ্য করে জীবন উৎসর্গ করে স্বদেশের মুক্তির সংগ্রামে। তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমা শহর এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল বাংলাদেশের কোনো বিচ্ছিন্ন এলাকা ছিল না। একাত্তরে ওই অঞ্চলে যে ঘটনা প্রবাহ সংঘটিত হয়, তা ছিল বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি।
বলাবাহুল্য উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে প্রধান চরিত্র ভাগীরথীকে কেন্দ্র করে। স্বামী ঘনশ্যাম। লালশ্যাম চার বছরের মেয়ে। সব মিলিয়ে ছোট সুখী পরিবার। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান দখলদার বাহিনী এ দেশে গণহত্যা শুরু করলে ঘনশ্যাম স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে আব্দুর রহিম নামে এক দালালের সঙ্গে পাকা কথাও হয়। কিন্তু এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানি মিলিটারি পিরোজপুর মহকুমা শহরের কেন্দ্রস্থলে হাই স্কুল দখল করে ক্যাম্প করলে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। এদেরই অন্যতম ছিলেন স্থানীয় মুসলিম লীগের সভাপতি সরদার সুলতান মাহমুদ। তিনিই পথ দেখিয়ে মিলিটারিদের ঘনশ্যামের বাড়ি নিয়ে যান। তারা ভাগীরথীকে বাড়ি থেকে তুলে মেজর ইস্কান্দার হায়াত খানের ক্যাম্পে নিয়ে যায়।
উপন্যাস পাঠে আমরা জানতে পারি: ‘ভাগীরথীকে ছোট ব্লাউজ আর হাফপ্যান্ট পরিয়ে রাখে। শাড়ি বা লম্বা সালোয়ার-কামিজ পরালে সুযোগ পেলেই ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে ক্যাম্পে ধরে আনা বাঙালি মেয়েরা। গত দু’মাসে কমপক্ষে চারজন মহিলা আত্মহত্যা করেছে।’
মেজর ইস্কান্দার হায়াত খান এক নারীতে সন্তুষ্ট থাকতেন না। তিনি ভাগীরথীকে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগের নিকট হস্তান্তর করে দেন। দিলদার বেগের নিকট আরেক দফা নির্যাতনের শিকার হয় ভাগীরথী। এখানে ভাগীরথী কৌশলে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগের মন জয় করে। ক্যাপ্টেন রূপে মুগ্ধ হয়ে ভাগীরথীকে বিয়ে করতে চায়। এই সুযোগে ছেলে লালশ্যামকে দেখার জন্য ক্যাপ্টেনের সম্মতি আদায় করে ভাগীরথী। কথা দেয় ছেলেকে দেখেই ক্যাম্পে ফিরে আসার। কিন্তু বাড়িতে গেলে ঘনশ্যাম তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করে না। সে ফিরে আসার সময় সন্তান লালচানকে সঙ্গে নিয়ে আসতে চাইলে ঘনশ্যাম তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভাগীরথীর সুখের সংসার ছারখার হয়ে যায়।
বাড়ি থেকে ক্যাম্পে ফেরার পথে ভাগীরথী মানসিকভাবে ছিল বিধ্বস্ত। লেখক জানাচ্ছেন: ‘স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ভাগীরথী। ওর চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। ভেসে যাচ্ছে সংসার। ভেসে যাচ্ছে স্বামী-স্ত্রী-পুত্র।’ ভাগীরথী মিলিটারি ক্যাম্পে ফেরার পথে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হানিফের সঙ্গে দেখা হয়। হানিফ তাকে মিলিটারিদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করলে সে রাজি হয়। ক্যাপ্টেন বেগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে মিলিটারি অপারেশনের বিভিন্ন তথ্য সে মুক্তিযোদ্ধাদের দিতে থাকে। তার দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে হানিফ মিলিটারির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সফল অপারেশন চালায়। ভাগীরথী একসময় ধরা পড়ে যায়। তার ওপর নেমে আসে ভয়ংকর নির্যাতন। তার দুই হাত জিপের সঙ্গে বেঁধে দুই কিলোমিটার পথ ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাগীরথীর শরীর ছিহ্নভিন্ন হয়ে যায়। ভাগীরথীর রক্তে রঞ্জিত হয় পিরোজপুর শহরের সড়ক। অবশেষে মৃতপ্রায় ভাগীরথীকে বলেশ্বর নদীতে ছুঁড়ে ফেলে হায়েনার দল।
১২০ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র কলেবরের উপন্যাস। কিন্তু ঔপন্যাসিক ক্ষুদ্র আয়তনে মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত অবয়ব ধরতে চেষ্টা করেছেন। অতি সাধারণ এক গৃহবধূর নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, সংসার-সম্ভ্রম হারিয়ে সময়ের অনিবার্য অভিঘাতে হয়ে ওঠে মুক্তি সংগ্রামের অকুতোভয় অংশীজন। একদিকে সে ছিল সন্তান বৎসল এক মা, অন্যদিকে মুক্তিকামী এক সহযোদ্ধা। নির্মম অত্যাচারেও সে মনোবল হারায়নি। বরং স্বদেশের মুক্তির জন্য কাজ করতে পারায় গর্ব অনুভব করেছে। দেশের জন্য অবিচল চিত্তে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিল সে। আর এভাবেই সে হয়ে উঠেছে একাত্তরের প্রতীক।
এই উপন্যাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র সর্দার সুলতান মাহমুদ। তার ব্যক্তিত্ব বলে কিছু ছিল না। হানাদার মিলিটারিদের পদলেহনে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। উপন্যাসের শেষের দিকে গেরিলা কমান্ডার হানিফ রহমানকে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। পাকিস্তানি আর্মির জন্য হানিফ রহমানের দল ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। আবার সেই গেরিলা কমান্ডারই ভাগীরথীর কাছে একেবারেই ভিন্ন মানুষ।কোনো হিংস্রতা নাই, নিষ্ঠুরতা নাই, লোভ নাই। হানিফ রহমান মানবতা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এক যুবক।
উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ঘনশ্যাম। পেশায় মুচি। ভাগীরথীর জন্য তার ছিল গভীর ভালোবাসা। মিলিটারির অত্যাচারে পরিবারসহ ঘনশ্যামের জীবন বিপন্ন হয়। এক সময় সে সময়ের কষাঘাতে হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন। কমান্ডার হানিফের কাছে দাবি জানান, দেশ স্বাধীন হলে রাজাকার সুলতান মাহমুদের বিচার তিনি নিজ হাতে করবেন।
উপন্যাসটির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এর ঘটনা প্রবাহ। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমা শহর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন, মানুষের জীবনে সেই ঘটনার অভিঘাত এবং তার প্রেক্ষিতে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ এই উপন্যাসের উপজীব্য। উপন্যাসের ঘটনা আবর্তিত হয়েছে প্রধান চরিত্র ভাগীরথীকে কেন্দ্র করে। তবে মেজর ইস্কান্দার হায়াত খান, ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ এবং রাজাকার প্রধান সুলতান মাহমুদের চরিত্র আরেকটু বিকশিত হতে পারতো।
উপন্যাসে পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের সার্বক্ষণিক মদ্যপ অবস্থায় দেখা যায়। বিষয়টি অনেক সময় আরোপিত মনে হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি জায়গায় এমন কিছু শব্দের ব্যবহার আছে, পড়ার সময় সেগুলো কানে বাজে। উপন্যাসে সংলাপেও কিছু জায়গায় পরিমিতি বোধের অভাব অনুভূত হয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো, ঘনশ্যাম হানিফের নিকট দাবি জানিয়েছিল, বউকে তার কাছে ফিরিয়ে এনে দিতে হবে। কিন্তু একপর্যায়ে ভাগীরথী যখন ফিরে আসে, তখন ঘনশ্যাম তাকে গ্রহণ না করে তাড়িয়ে দেয়। বিষয়টি পরস্পরবিরোধী মনে হয়। তবে এসব ছোটখাটো বিষয় উপন্যাসের মহৎ ব্যঞ্জনা খর্ব করতে পারেনি। ভুক্তভোগী মানুষের জীবনে একাত্তরের ওই বিপন্ন সময় যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল, লেখক সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই উপন্যাসে। উপন্যাসের ভাষা প্রাঞ্জল।উপন্যাসের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, পাঠককে ঘটনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে হয়। নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয় না। এখানেই ঔপন্যাসিকের সার্থকতা।