প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো নিষ্ঠুর আচার ‘সেপুক্কু’ জাপানে এখন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু এ নিয়ে আজও জাপান তো বটেই পুরো বিশ্বেই কম-বেশি আলোচনা করা হয়। পশ্চিমা বিশ্বে অনেকেই ‘হারাকিরি’ শব্দের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু জাপানি প্রেক্ষাপটে সঠিক শব্দটি ‘সেপুক্কু’। যার আক্ষরিক অর্থ ‘পেট কাটা’।
প্রাচীন জাপান-এর বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের আত্মা বা সাহসের কেন্দ্র থাকে পেটে। তাই পেট কেটে মৃত্যু বেছে নেওয়া মানে নিজের আত্মাকে নিজের হাতে মুক্ত করা—এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত প্রকাশ। সম্মান বনাম জীবন: কোনটা বড়?
সমুরাইদের জীবন পরিচালিত হতো বুশিদো নামের নীতিতে—যেখানে সম্মান ছিল জীবনের থেকেও মূল্যবান। তারা মনে করতো— যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়া মানে শুধু নিজের অপমান নয়, পুরো পরিবারের লাঞ্ছনা। অপমান থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সেপুক্কু ছিল একমাত্র পথ। নিজের হাতে মৃত্যু বেছে নিয়ে তারা প্রমাণ করতেন—তাদের আত্মসম্মান কারও দয়ার উপর নির্ভরশীল নয়।
শুরুর দিকে সেপুক্কু ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—এক ধরনের আত্মত্যাগ। কিন্তু ১২শ শতাব্দী থেকে এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় শাস্তির রূপ নেয়। জাপানি সংস্কৃতিতে যদি কোনো সমুরাই গুরুতর অপরাধ করতেন—বিশ্বাসঘাতকতা, ব্যর্থতা বা অসম্মানজনক কাজে লিপ্ত হতেন—তাহলে শাসক তাকে সেপুক্কু করার আদেশ দিতেন।
এটি ছিল এক অদ্ভুত অনুগ্রহ—কারণ সাধারণ অপরাধীর মতো অপমানজনক মৃত্যুর বদলে তিনি নিজের হাতে, সম্মান বজায় রেখে মৃত্যুবরণ করতে পারতেন।
সেপুক্কু কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়—এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং আচারসম্মত।
সাদা কিমোনো পরানো হতো। এরপর শেষবার গোসল করে, প্রিয় খাবার গ্রহণের সুযোগ পেতো দণ্ডিত ব্যক্তি। মৃত্যুর আগে একটি কবিতা লিখতে হতো যার নাম ডেথ পোয়েম। তারপর পেটের বাম দিক থেকে ডান দিকে ছুরি চালিয়ে মৃত্যু বরণ করতে হতো।
এই সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন একজন সহকারী, যাকে বলা হতো ‘কাইশাকুনিন’। যন্ত্রণার সীমা ছাড়িয়ে গেলে তিনি এক আঘাতে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিতেন—যাতে মৃত্যু দ্রুত হয়।
১৮৭৩ সালে সরকারিভাবে সেপুক্কু নিষিদ্ধ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবু এর দর্শন—সম্মান, আত্মনিয়ন্ত্রণ, লজ্জাবোধ—আজও জাপানি সমাজের গভীরে প্রভাব ফেলে। সেপুক্কু শুধু একটি নিষ্ঠুর আচার নয়। এটি মানুষের আত্মসম্মান, নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রণা সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতার গল্প।