সাতসতেরো

চীনের মহা প্রাচীর তৈরির নেপথ্যে রয়েছে যে গল্প

চীনের মহা প্রাচীর—শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং মানব সভ্যতার এক অসাধারণ সাক্ষ্য। Great Wall of China বা ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’ পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর নির্মাণ, যা চীনে ‘চাং চেং’ বা ‘দীর্ঘ প্রাচীর’ নামে পরিচিত। মাটি, পাথর ও ইট দিয়ে তৈরি এই বিশাল প্রাচীরটি প্রাচীন চীনের সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এটি শুধু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্থাপত্যই নয়, বরং ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি নির্মাণ প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবেও বিবেচিত হয়।

নির্মাণের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট চীনের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত রক্ষা এবং যাযাবর গোষ্ঠীর আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য এই প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত এই দেয়ালটি মূলত বিভিন্ন ছোট ছোট দুর্গ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক Sima Qian তার লেখায় একে ‘১০,০০০ মাইল দীর্ঘ প্রাচীর’ বলে উল্লেখ করেছিলেন—যা প্রকৃত দৈর্ঘ্য নয়, বরং এর বিশালত্ব বোঝানোর প্রতীক।

খ্রিস্টপূর্ব ৫ম থেকে ৮ম শতাব্দীর মধ্যেই চীনের বিভিন্ন রাজ্য—কিন, ঝাও, ইয়ান প্রভৃতি—নিজেদের সীমানা রক্ষার জন্য আলাদা আলাদা দেয়াল নির্মাণ শুরু করে। এসব দেয়াল ছোটখাটো আক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম হলেও, বৃহৎ আক্রমণের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ছিল না।

কিন সাম্রাজ্যের অবদান খ্রিস্টপূর্ব ২২১ সালে চিন শি হুয়াং পুরো চীনকে একত্রিত করে প্রথম সম্রাট হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি পূর্ববর্তী রাজ্যগুলোর দেয়াল ভেঙে দিয়ে উত্তর দিকের আক্রমণ ঠেকাতে সেগুলোকে সংযুক্ত করে একটি বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণের নির্দেশ দেন। এ সময় স্থানীয়ভাবে পাওয়া মাটি ও পাথর দিয়েই নির্মাণকাজ চালানো হয়, যা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।

পরবর্তী রাজবংশের সংস্কার পরবর্তীতে হান, সুইসহ বিভিন্ন রাজবংশ এই প্রাচীরের সম্প্রসারণ ও সংস্কার করে। মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর দিক থেকে আসা যাযাবর জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণ প্রতিহত করা। তবে সময়ের সাথে সাথে প্রাচীরের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্তও হয়।

মিং সাম্রাজ্যের পুনর্নির্মাণ ১৪শ শতাব্দীতে মিং সাম্রাজ্যের সময় প্রাচীরটি নতুন রূপ পায়। বিশেষ করে টুমু যুদ্ধের পর তারা প্রতিরক্ষা জোরদার করতে ইট ও পাথর দিয়ে মজবুত দেয়াল নির্মাণ করে। এ সময় প্রায় ২৫,০০০ ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করা হয়। তবুও মঙ্গোলদের আক্রমণ পুরোপুরি থামানো সম্ভব হয়নি, ফলে নিয়মিত মেরামতের প্রয়োজন হতো।

আধুনিক যুগে পরিচিতি সেকেন্ড ওপিয়াম ওয়ার -এর পর চীনের সীমান্ত বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হলে বিশ্বের মানুষ প্রথমবারের মতো এই প্রাচীর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে এটি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

মিথ ও বাস্তবতা চীনের মহা প্রাচীরকে ঘিরে বহু মিথ প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি হলো—এটি নাকি চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহ থেকেও দেখা যায়। বাস্তবে এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সাম্প্রতিক আবিষ্কার ২০০৯ সালে প্রাচীরের প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নতুন অংশ আবিষ্কৃত হয়, যা পাহাড় ও গর্তের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। এই অংশ শনাক্ত করতে ইনফ্রারেড প্রযুক্তি ও জিপিএস ব্যবহার করা হয়, এবং এটিও মহা প্রাচীরের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চীনের মহা প্রাচীর কেবল একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো নয়, এটি হাজার বছরের ইতিহাস, পরিশ্রম ও স্থাপত্য কৌশলের প্রতীক। সময়ের পরিক্রমায় এটি যুদ্ধের স্মারক থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অমূল্য নিদর্শনে পরিণত হয়েছে, যা আজও মানুষের কৌতূহল ও বিস্ময় জাগিয়ে রাখে।