সাতসতেরো

‘পয়লা মে দিবস’ এর ইতিহাস

একসময় আমেরিকা ও ইউরোপে পয়লা মে— তারিখটি ‘ফুল খেলবার দিন’ হিসেবে পালিত হতো। সেই দিনটি এখন পয়লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। দিনটি বিশ্বের মানুষের কাছে মে দিবস হিসেবেও পরিচিত। উনিশ শতকের শেষভাগে শিল্পবিপ্লবের জোয়ার শুরু হলো। আমেরিকার কারখানাগুলোতে তখন দিন-রাত মানুষের ব্যস্ততা। দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ, সামান্য মজুরি, নেই কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বিশ্রামের নিশ্চয়তা। এই শোষণ আর অবিচারের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করেন শ্রমিকেরা। ১৮৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার, যা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেয়।

১৮৮৪ সালে এই সংগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে শুরু হবে সর্বাত্মক আন্দোলন, যার মূল দাবি হবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি। সেই লক্ষ্যে নির্ধারিত দিনে, ১ মে ১৮৮৬ সালে, শিকাগোসহ আমেরিকার বিভিন্ন শহরে প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নেন। আগত শ্রমিকদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় একটি সহজ কিন্তু গভীর দাবি—‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা অবসর।’

কিন্তু শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনের জবাব আসে সহিংসতায়। ধর্মঘট দমন করতে পুলিশ নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর গুলি চালায়। কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন, অসংখ্য মানুষ আহত হন। ৩ মে ম্যাককর্মিক হার্ভাস্টার কারখানার সামনে আবারও সংঘর্ষ বাধে, যেখানে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আরও ছয়জন শ্রমিক। এর প্রতিবাদে ৪ মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে একটি বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই সমাবেশও রক্তাক্ত পরিণতি এড়াতে পারেনি। পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রহসনমূলক বিচারে তাঁদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। শিকাগোর এই রক্তাক্ত ঘটনা শুধু একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের মনে গভীর আলোড়ন তোলে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, শিকাগোর শ্রমিকদের এই আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হবে। ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এটি শ্রমিকদের ঐক্য ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে ১৯০৪ সালে আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী ১ মে মিছিল ও শোভাযাত্রার আহ্বান জানানো হয়, যাতে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের দাবি এবং বিশ্বশান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের অনেক দেশে ১ মে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

পয়লা মে তাই কেবল একটি দিন নয়, এটি মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক।