আমার মা’র পক্ষে রাজনীতিতে আগ্রহী হওয়ার কথা ছিল না। তিনি হনওনি, কিন্তু বিদ্যমান রাজনীতির ঝাপ্টা তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে বৈকি, বৃক্ষ যেমন সহ্য করে ঝড়। রাষ্ট্রের উত্থানপতন দেখেছেন, টের পেয়েছেন, উদ্বাস্তু হয়েছেন বারবার, মুখোমুখি হয়েছেন দুর্ভিক্ষ-পরিস্থিতির।
আমরা ছেলেরা রাজনীতি নিয়ে কথা বলতাম, রাজা-উজির মারার খেলায় অংশ নিতাম। তর্ক-বিতর্ক চলতো। আমার মা দেখতেন। যেন খেলা দেখছেন। ছেলেদের ব্যাডমিন্টন খেলা। অথবা ফুটবল। তিনি ঝালমুড়ি, ডালের বড়া, ডালপুরী, চা ইত্যাদি সরবরাহ করেছেন, আমাদের সতেজ রাখবার জন্য। ভেতরে ভেতরে হাসতেন হয়তো, এই ভেবে যে তাঁর ছেলেরা বড় হয়েও ঠিক বড়টি হলো না।
ছেচল্লিশ সাতচল্লিশে বাম আন্দোলন বড় প্রবল। ছাত্র শ্রমিক কৃষক সকল এলাকাতেই বামপন্থিরা সক্রিয়। প্রতিষ্ঠিত স্বার্থ চায়নি বামপন্থিরা শক্তিশালী হোক। আমার বাবা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’র গ্রাহক ছিলেন না, গ্রাহক ছিলেন প্রথমে ‘আজাদে’র পরে ‘ইত্তেহাদে’র, কিন্তু তাঁকে বলতে শুনেছি স্বাধীনতার কথা আসলে ‘আনন্দবাজার’ বলে না, ‘আজাদ’ও নয়, বলে ওই ‘স্বাধীনতা’ই। বামপন্থিরা নিজেরা নানা রকমের ভুল করেছেন, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই তাদের বিরুদ্ধে ছিল, আর ব্রিটিশ সরকার তো অবশ্যই। ক্ষমতা হস্তান্তরিত হল কংগ্রেস ও লীগের কাছে এবং বামপন্থিরা নিগৃহীত হতে শুরু করলেন, সীমান্তের উভয় পার্শ্বে।
পাকিস্তানে মুসলিম লীগই সর্বেসর্বা। পূর্ববঙ্গেও তাই; তবে অচিরেই নতুন রাজনৈতিক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে; কিন্তু সেও ওই মুসলিম লীগের ভেতর থেকেই, নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ অর্থাৎ জনগণের মুসলিম লীগ। এই নতুন দলে বামপন্থি কর্মীরা ছিলেন, কিন্তু তাঁরা নেতৃত্বে যেতে পারেননি, এমনকি টিকে থাকতেই পারেননি, দলের ভেতরে; বের হয়ে এসে তাঁদেরকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করতে হয়েছে, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। বিবেচনা ছিল দুটো, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী পররাষ্ট্রনীতি। আওয়ামী লীগের প্রধান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, তিনি যেহেতু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন তাই স্বায়ত্তশাসনের আর কোনো সমস্যা নেই, আটানব্বই শতাংশ স্বায়ত্তশাসন পাওয়া হয়েই গেছে, বাকিটার জন্য আন্দোলন দরকার নেই, সেটার বন্দোবস্ত তিনিই করবেন; সংখ্যাসাম্যের মাধ্যমে ব্যবস্থাটা করা হবে কি না তা অবশ্য বলেননি, কিন্তু মনের মধ্যে হয়তো ওই সমাধানই খেলা করছিল।
তাঁর মৃত্যুর পরে শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাসাম্য মানেননি, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছেন, কিন্তু পররাষ্ট্র নীতির ব্যাপারে তিনিও তাঁর নেতার মতো মার্কিনঘেঁষাই ছিলেন। মার্কিনীরা স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সমর্থন করেছে। তাদের বিবেচনাটা ছিল এই যে, সমর্থন না দিলে আন্দোলন চলে যাবে বামপন্থিদের হাতে। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন যখন স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত হলো তখন তারা পিছিয়ে গেল। কেননা তাদের ধারণা হলো যে, ঘটনা প্রবাহ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। শেখ মুজিবও দেখলেন যে, এই উত্তাল আন্দোলনকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন না, যে জন্য তিনি পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হওয়াটাই বরঞ্চ মেনে নিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কিন্তু আমেরিকানরা আবার ফিরে এসেছে, তাদের ক্ষমতার জোরে। ফিরে আসবার পথটা পরিষ্কার করবার প্রয়োজনে তারা কিছুটা দোদুল্যমান শেখ মুজিবকে হটিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ অনুগত খন্দকার মোস্তাককে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে টাকার শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। টাকা সব সময়েই জরুরি ছিল, কিন্তু আগে কখনো এতটা ছিল না যতটা স্বাধীনতার পরে লাভ করেছে। ব্যাঙ্ক লুট, খেলাপি ঋণ, ভাড়াকরা খুনি সবকিছুই টাকার শাসনের লক্ষণ।
দেশে একটা দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে, অতীতের সেই কংগ্রেস-মুসলিম লীগের মতো। দু’দলের উভয়েই সাম্রাজ্যবাদের অনুরাগী ও পুঁজিবাদের অনুসারী- যেমন ছিল বিএনপি তেমনি আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরিণতিতে বাংলাদেশে একটি সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হবে বলে অনেক আশাবাদী আশা রেখেছিলেন, কিন্তু নানাবিধ প্লাবনের এই বিপন্ন ভূমিতে সে-নদী অচিরেই শুকিয়ে গেছে, আরো অনেক নদীর মতো। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ— দুই দলই এখন অতীতের মুসলিম লীগে পরিণত; বিএনপি’র পরিণতিটা আদর্শগত, আওয়ামী লীগেরটা সাংগঠনিক। আমরা এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বিস্তর সমালোচনা করছি। বিদ্রূপও করি। কিন্তু আমাদের সব কথাই কথার কথা। আড্ডাবাজি। কিংবা তর্ক যদি বাধে তবে ব্যাডমিন্টন খেলা, বড় জোর কষে ফুটবল। আমার মা সেটা জানেন; বুদ্ধি দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে।
আরো একটি রাজনীতি আছে, যেটা পারিবারিক; যেখানে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি প্রতিফলিত ও পুনরুৎপাদিত হয়। এবং মানুষ যে একটি রাজনৈতিক প্রাণী তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অগণতান্ত্রিক সমাজে পরিবারগুলোও গণতান্ত্রিক নয়, হতে চাইলেও বাধা পায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হতে চায়ই না। রাজনীতির মর্মবস্তুটি হচ্ছে ক্ষমতা; ক্ষমতা কোথায় থাকবে বা থাকবে না সে নিয়ে পরিবারের ভেতর দ্বন্দ্ব থাকে, থাকা স্বাভাবিকও বটে।
আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দ-পনের বছর বয়সে। শাশুড়ি তাঁর মায়ের বয়সী; কিন্তু মা নন। সম্পূর্ণ অপরিচিত মহিলা। শাশুড়ি নিজে বিধবা; এতকাল সবেধন নীলমণি পুত্রের ওপর তাঁর একছত্র অধিকার ছিল। এখন একজন প্রতিদ্বন্দ্বী এসেছে। তাই ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল অনিবার্য, ছিল স্বাভাবিক। ক্ষমতা যাঁদের কম তাঁরাই তো ক্ষমতার বিষয়ে অধিক সচেতন। বিরোধ বাধেনি, কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো অজুহাতে মনোমালিন্য, এবং সেখান থেকে সংঘাত শুরু হয়ে যেতে পারতো। তেমনটা যে ঘটেনি তার কারণ কেবল যে আমার মা তা নয়, তাঁর শাশুড়ি, আমার দাদীও। এ বিষয়ে তাঁরা উভয়েই সজাগ ছিলেন, ছাড় দিচ্ছিলেন পরস্পরকে। কেননা তাঁরা জানতেন একবার ঝগড়া লাগলে নিরসন কঠিন হবে, জোড়া লাগলেও দাগ রয়ে যাবে চিরস্থায়ী, ক্ষতি হবে উভয়ের, তার চেয়েও বেশি ছিল যে বিবেচনা সেটা হলো, কষ্ট পাবেন সেই ব্যক্তিটি যাঁকে নিয়ে ওই দ্বন্দ্ব।
আমার বাবা রাজশাহীতে প্রথম যখন বাসা নেন, তখন সে-বাসাতে শাশুড়ি ও পুত্রবধূ এক সঙ্গেই ছিলেন। আমার মা সমস্ত ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ির হাতে, নির্দ্বিধায়। আর সেটা করেই তিনি জিতে গিয়েছিলেন পারিবারিক রাজনীতিতে। শাশুড়ি দেখলেন ঠিক হচ্ছে না। বিবাহিত পুত্রের সংসারে তাঁর এমন সর্বময় কর্তৃত্বটা অস্বাভাবিক। পুত্রবধূর অব্যাহত আত্মত্যাগ হয়তো শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন কোনো ঘটনার ঘটনা না হোক ক্ষতের সৃষ্টি করবে যার ক্ষতিপূরণ সম্ভব হবে না। তিনি সরে গেলেন। শহর তাঁর ভালো লাগছে না বলে গ্রামের বাড়িতে চলে এলেন।
শহর হয় তো সত্যি সত্যি ভালো লাগছিল না। কিন্তু সেটা মোটেই আসল কারণ নয় গৃহে প্রত্যাগমনের। আসল ঘটনা দ্বন্দ্ব পরিহার করা। পুত্রবধূ এক পা পিছিয়েছে, তিনি দু’পা ফেলে ঘটনাস্থলই ত্যাগ করে চলে গেলেন। এই জ্ঞান তাঁর টনটনে ছিল যে, সংঘর্ষ বাধলে সেটা খুবই ক্ষতিকর হবে। তাছাড়া যাকে নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সেই যুবক তাঁর সমস্ত স্নেহের কেন্দ্রবিন্দু বটে, কিন্তু ছেলের দিক থেকে দেখতে গেলে তিনি তো একক নন, আরো একজন আছে, যার প্রতি পুত্রের আদর্শ ও কর্তব্যবোধ দুটোই কাজ করবে। এও তো খেয়ালে ছিল তাঁর যে, যতই যা হোক আমার পিতা তাঁর আপন সন্তান নন, দেবরপুত্র মাত্র। আমার বাবা অতিঅল্প বয়সে পিতা ও মাতা উভয়কেই হারিয়েছিলেন। সন্তানের স্নেহে তাঁকে লালনপালন করেছেন তাঁর চাচী, যিনি তাঁর খালাও হন। চাচীকে তিনি মা বলেই জানতেন ও মানতেন। আবার দাদী ঠিক করেছিলেন যার সংসার তাঁর হাতে তুলে দেবেন, দিয়ে সসম্মানে অবসর নেবেন।
দাদীর গ্রামে ফেরার পর আমরাও গ্রামে গিয়েছি। গোটা পরিবার। খুব স্পষ্ট না হলেও মনে আছে, আমি দাদীর সঙ্গে থাকা পছন্দ করতাম, দিনে এবং রাতেও। শীতের সময়ে সকালে সন্ধ্যায় আগুনের মালশা নিয়ে বসতেন তিনি। কোলে আলোয়ান-জড়ানো অবস্থায় থাকতাম আমি। কতটা দুষ্টু ছিলাম জানি না, নাকি হাত বাড়িয়ে আগুন ছুঁয়েছিলাম একবার, যাতে হাত পুড়েছিল। সে কলঙ্ক-রেখা আমি আমার ডান হাতের তালুর উল্টো পিঠে অনেককাল বহন করেছি। যে-রাতে তিনি চলে যাবেন, সে-রাতে মা’কে ডেকে নাকি বলেছিলেন, ‘বউ-মা তোমার ছেলেকে তোমাদের কাছে রাখো। ও হয়তো ভয় পাবে।’ কিসের ভয় আমার মা বোঝেননি। জিজ্ঞাসাও করেননি। ওই রাতেই আমার দাদী মারা যান।
মায়ের দিক থেকে ক্ষমতার একটা লড়াই আমার বাবার সঙ্গেও ছিল। ওখানেও তিনি ছাড় দিয়েছেন। ত্যাগ নয়, দান নয়, অনাসক্তি। কলহে যাননি, আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করেননি, সরে গেছেন। আর সেখানেই হেরে গেছেন আমার বাবা, কর্তৃত্ব করেছেন ওপরে ওপরে, কিন্তু সংসার ছিল মায়ের হাতে। সন্তানদের ওপর তাঁর যত কর্তৃত্ব প্রভাব যদিও তত নয়।
নিজে যখন শাশুড়ি হয়েছেন তখন একদা তাঁর শাশুড়ি তাঁর ওপরে যে-রাজনীতি কার্যকর করেছিলেন, তিনিও সেই পথেই অটল থেকেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাননি। সরে এসেছেন। ঠাঁই নিয়েছেন আপন সংসারে। বিশেষ করে এখন তো দেখতে পাই যে, আমি যতটা না আমার বাবার সন্তান তার চেয়ে বেশি আমার মায়ের। বাবা-মা’য়ের প্রভাব সন্তানের ওপর তো থাকবেই, থাকেও; কারটা কত শক্তিশালী সেটা মাপবার কোনো নির্ভরযোগ্য যন্ত্র নেই। আমি জানি আমার পিতার প্রভাব আমার ওপর মোটেই কম নয়, কিন্তু মায়ের ছাপটা ততোধিক, আর যেহেতু তা গভীর তাই অনির্দিষ্ট। আমি বেড়ে উঠেছি আমার বাবার উৎসাহে এবং মায়ের আশ্রয়ে। আশ্রয় অধিক কার্যকর, উৎসাহের তুলনায়। উৎসাহ ও আশ্রয়ের ভেতর এই বিভাজনটা অবশ্য খাড়াখাড়ি করা যাবে না; তাছাড়া বাবার মধ্যেও মায়ের স্নেহ ছিল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনিও ছিলেন মাতৃস্বভাবসম্পন্ন।
আমার মা’য়ের মতো আমিও উন্নতিবিরোধী। ছাড় দিই, সরে আসি, সন্তুষ্ট হয়ে যাই অল্পতেই। আমিও পছন্দ করি আত্মীয়তা। আমার মা তাঁর আত্মীয়তাপ্রীতি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে—আমার নানীর কাছ থেকে। ওদিকে আমার বাবার সাথে আমার নানার একটা মিল ছিল— উভয়েই ছিলেন পরিবারতান্ত্রিক। কিন্তু নানী ছিলেন আলাদা মানুষ, সংসারের মধ্যে থেকেও তিনি ছিলেন অনাসক্ত। আমার ধারণা কিছুটা অনাসক্তি আমার নিজের মধ্যেও রয়েছে। আমার মা সেটা কতটা লক্ষ্য করেছিলেন জানি না, কিন্তু আমার একমাত্র খালা; মায়ের বড় বোন যে লক্ষ্য করেছিলেন তা জেনেছি। আমার নিঃসন্তান খালা আমাকে বড়ই স্নেহ করতেন। আমার বিয়ের পরে আমার স্ত্রীকে নাকি তিনি বলেছিলেন, ‘বউমা, দেখবে তুমি, আমাদের ছেলেটা কিন্তু দরবেশ।’ অনেক পরে আমার স্ত্রী আমাকে পরিহাস করে বলেছেন যে, ওই খবর পেয়ে তিনি অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য আশ্বস্ত হয়েছেন যে, এক্ষেত্রে দরবেশ অর্থ সংসারত্যাগী বুঝলে চলবে না, বুঝতে হবে গরিব।
অনাসক্তি আমার পিতার গুণগুলোর একটি ছিল না, তিনি বরঞ্চ অস্থির হতেন পান থেকে চতু খসতে দেখলে। খুঁটিনাটি লক্ষ্য করতেন, অত্যন্ত দক্ষ গোয়েন্দার মতো। আশাবাদী হওয়ার ব্যাপারে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল, এবং আশা করতেন বলেই হতাশও হতেন বড় সহজেই। বেশ চরমপন্থি, যা ভালো মনে করতেন তাকে আকাশে তুলতেন, যা খারাপ ভাবতেন তাকে ফেলে দিতেন একেবারে পাতালে। আমার মা সেটা করতে পারতেন না। এখন তো মনে হয় খুব ভালো হতো আমি যদি আরো অধিক পরিমাণে আমার মায়ের স্বভাব পেতাম। তাহলে আমার ভেতরকার অস্থিরতাটা কমতো। বড় সমস্যায় আমার বাবা তবু অচঞ্চল থাকতে পারতেন, কিন্তু ছোট ছোট ব্যাপারে দেখেছি খুব চঞ্চল হয়ে পড়ছেন। তখন কলিং বেল ছিল না, কড়া নাড়বার ব্যবস্থা ছিল; তাঁর কড়ানাড়া শুনলে না বুঝে কোনো উপায় থাকতো না কে এসেছেন।
ওদিকে আমার মা? সর্বদাই শান্তপ্রবাহ। কী করে তিনি স্থির থাকতেন, এখনো থাকেন, আমি জানি না। তাঁর স্বামী চলে গেলেন, একটি পুত্র চলে গেলো, সবচেয়ে ন্যাওটা ছিল যে ছেলে সে গিয়ে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে আমেরিকায়। তাঁর দুই ভাই এবং একমাত্র বোন আগেই চলে গেছেন, একের পর এক। সর্বকনিষ্ঠজনও গেলেন কয়েক মাস আগে। তাঁর সমবয়স্কদের অধিকাংশই আজ নেই, কমবয়স্কদেরও কেউ কেউ বিদায় নিয়েছেন। তিনি দেখছেন, সহ্য করছেন, কান্নাকাটি করেছেন, কিন্তু ভেঙে পড়েননি, আত্মসংবরণ করে রয়েছেন, স্থির সাক্ষীর মতো। উপেক্ষা করেন, অপেক্ষা করেন। যতটা সম্ভব অবিচলিত থাকেন। আমি পারি না, আমি বড় সহজে চঞ্চল, উদ্বেল, উদ্বিগ্ন ইত্যাদি হই, ভয় পেয়ে যাই; আবার উৎফুল্লও হই খুব সহজে। মনের দিক থেকে আমি আমার মায়ের মতো নই; মানসিক ভাবে আমি নিতান্তই নিম্নমধ্যবিত্ত। ভালো হতো যদি অনাসক্তি আরো গভীর হতো, যেমনটা আমার মায়ের মধ্যে দেখেছি। আমার ভেতরে কিছুটা আমলাতান্ত্রিকতা যে নেই তা নয়, ওটি বাবার কাছ থেকে পাওয়া; চমৎকার হতো ও-জিনিস না থাকলে। আমার মায়ের মধ্যে যা ছিল না।
সংকোচ পুরুষের গুণ কি না জানি না। কিন্তু এটি যে আমার মায়ের নিজস্ব বন্ধু তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি হয়তো, হয়তো-বা নিজের ভেতরে সংরক্ষিত আকারে রেখেছি তাঁর কাছ থেকে পেয়ে। যে জন্য আমার খুব দ্বিধা, প্রত্যক্ষ হতে। আড়াল পেলে বেঁচে যাই। দায়িত্ব নেওয়াতেও সংকোচ। ভালো লাগে ছদ্মনামে লিখতে। সংকোচকে উন্নাসিকতা ভাবা কষ্টকর নয়; আমার আচরণও উন্নাসিকতার দায়ে অভিযুক্ত হতে পারে বৈকি, হয়নি যে তাও নয়, কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে বিশুদ্ধ লাজুকতা, অন্যকিছু নয়। এই যে আমি লিখছি, এতে নিজের কথা আসছে, কিন্তু আসছে মায়ের জন্য সাক্ষীর বক্তব্য হিসেবে, আত্মকথন বলে নয়।
কিন্তু আমি পেছনে পড়ে থাকি আমার মা’য়ের, একটি বিশেষ জায়গায়, সেটা আতিথেয়তার। ওইখানে আমি ভয় পেয়ে যাই, আমার বাবাও পেতেন, আমার মা মোটেই পান না। আতিথেয়তার ব্যাপারে তাঁকে আমরা অসীম সাহসী বলেই জানি। মেহমান পেলে খুশি হন, চলে গেলে বিষণ্ন। সামান্য উপকরণ নিয়ে অসামান্য আপ্যায়নে তাঁর দক্ষতা আমার কখনো আয়ত্বগত হবার ছিল না, হয়ওনি। এমএ পরীক্ষা দিয়ে আমি কয়েক মাস চাকরি করেছি মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে। সপ্তাহান্তে একবার আসতাম, আবার যেতাম সপ্তাহের শুরুতে। হাসতে হাসতে একদিন মা বলেছিলেন, ‘তা বাবা সেলিম, মুন্সিগঞ্জ তো মিষ্টির জন্য বিখ্যাত; মিষ্টি আনায় অসুবিধা আছে, হাঁড়ি লাগবে, কিন্তু কলাও তো পাওয়া যায়, সেটা তো আনা যায় তোর ব্যাগের ভেতর রেখেই, তাই না?’ শুনে বড় লজ্জা পেয়েছিলাম আমার কাণ্ডজ্ঞানের অভাব দেখে। কিন্তু আনা হয়নি, ওই লজ্জাতেই; মনে হয়েছে এর পরে মায়ের সামনে ওই উপহার নিয়ে হাজির হওয়া অপরাধ স্বীকারের শামিল হবে। বেঁচে গেছি মুন্সিগঞ্জে যাতায়াত বন্ধ হওয়াতে।
আত্মীয়তার ব্যাপারটাতে একটা পিছুটান থাকে, কিছুটা অতিরিক্ত মাখামাখি, ভাবটা ভেজা ভেজা, ভাবালু; বন্ধুত্ব জিনিসটা সেদিক থেকে চটপটে এবং আধুনিক। আমরা আত্মীয়তার কাল ছেড়ে বন্ধুত্বের কালাভিমুখে অগ্রসর হয়েছি; সেটা একটা অগ্রগতি নিশ্চয়ই, কিন্তু তারও একটা সীমা রয়েছে। সর্বজনীন বন্ধুত্ব আসেনি, তাই বুঝি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়া আমাদের পক্ষে সহজ হচ্ছে না।
২ একটা জগৎ প্রয়োজনের আরেকটা জগৎ স্বাধীনতার। আমার মা কি প্রয়োজনের জগৎ ছেড়ে স্বাধীনতার জগতে যেতে পেরেছেন? সেটা তো মস্ত ব্যাপার। তবু আমার মনে হয় পেরেছেন, তাঁর নিজের মতো করে। কি করে পারলেন? তিনি তো দার্শনিক নন। পৃথকীকরণ, সংজ্ঞানিরূপণ এসবে আগ্রহ দেখিনি। হৃদয়কে বড় মনে করেন, বুদ্ধির চেয়ে। নিজে তিনি নানাভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছেন; স্ত্রী, মাতা, শাশুড়ি, বোন, ফুপু বিভিন্ন ভূমিকা তাঁর, কিন্তু উৎসাহী ছিলেন না অন্য ব্যক্তি কিংবা বস্তুর সংজ্ঞা নিরূপণে। তবু একটা দার্শনিকতা আছে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে, যার মূল উপাদান অনাসক্তি। আছেন অথচ নেই। সব কাজ করছেন তবু জালের মধ্যে আটকা পড়েননি। আরো একটা কথা, প্রয়োজন যে কতটা তাও তিনি জানতেন না।
বাঙালির ইতিহাস নেই, আমরা অভিযোগ শুনি; যে-ইতিহাস রয়েছে গৌরবের ভাগটা বড় অল্প; সে জন্যই বোধ করি বলা সম্ভব যে আমরা জীবনযাপন করেছি কিন্তু ইতিহাস তৈরি করতে পারিনি, হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠেছি, কিন্তু ধারাবাহিকতা থাকেনি। ইতিহাস তৈরি হয় স্থানের সঙ্গে কালের দ্বন্দ্বে। আমাদের ক্ষেত্রে ওই দ্বন্দ্বটা বাধেনি, কেন না স্থান রুখে দাঁড়াতে পারেনি সময়ের বিরুদ্ধে, বলতে পারেনি নিশ্চিত করে কোনটা নেবে কোনটা নেবে না; মেনে নিতে হয়েছে ঝড় ও ঝাপটাকে। হাতী গন্ডার শৃগাল উৎপাত করেছে নানাভাবে। আমার মায়ের জীবনও ওইরকমই। তিনি আছেন, কিন্তু তাঁর ইতিহাস নেই। আমাদের মাতৃভূমির মতোই।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়