যে শহরের চারপাশে এক সময় কাকের বিচরণ ছিল খুবই স্বাভাবিক, যেখানে ভোরের প্রথম আলো ফুটত মোরগের নয়, কাকের কর্কশ কিন্তু চেনা কণ্ঠের ডাকে; সেই ঢাকায় কাক হরহামেশা আর দেখা যায় না। আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকেও বুড়িগঙ্গা-বিধৌত এই শহরের রোজনামচা শুরু হতো একটা অলিখিত নিয়মে জানালার কার্নিশে, ছাদের চিলেকোঠায় কিংবা উঠোনে গাছের ডালে বসা একঝাঁক কাকের ‘কা-কা’ ডাকে। সেই ডাক ছিল ঢাকার নিজস্ব অ্যালার্ম ঘড়ি, নাগরিকের ঘুম ভাঙানোর আদিম সাইরেন।
২০২৬ সালে এসে এই যান্ত্রিক অতি-নগরায়ণের যুগে ভোরে কান পাতলে শুধুই শোনা যায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের যান্ত্রিক গুঞ্জন, হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কনস্ট্রাকশনের একঘেয়ে আওয়াজ আর রাজপথের তীব্র হর্ন। ঢাকা আজ কংক্রিটের খাঁচা। পরিবেশের সবচেয়ে বড় ‘প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ অথচ অবহেলিত প্রাণী কাক আজ আর সেভাবে দেখা যায় না। কেন হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার কাক? এই নিখোঁজ সংবাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে কি পরিবেশগত কোনো বিপর্যয়?
কাকের এই হারিয়ে যাওয়াটা সবচেয়ে বুকভাঙা বেদনা হয়ে বাজছে পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দাদের মনে। যেখানে একসময় মানুষের চেয়ে পাখিদের কোলাহল বেশি ছিল, সেই ঘিঞ্জি গলির স্মৃতির কথা জানাচ্ছিলেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা সংবাদকর্মী মোহাম্মদ শাহজাহান স্বপন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘‘আমাদের ছোটবেলায় কাক ছিল ঘরের মানুষের মতো। মা-চাচিরা যখন শীতের দিনে ছাদ বা উঠোনে ডাল শুকাতে দিতেন, কিংবা আমের আচার দিতেন, তখন একটা বাঁশের লাঠি হাতে কাকের হাত থেকে ওগুলো পাহারা দেওয়াই ছিল আমাদের প্রধান কাজ। একটু চোখের আড়াল হলেই ছোঁ মেরে নিয়ে যেত। সেই চুরির মধ্যেও একটা আনন্দ ছিল।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘কাক প্রচণ্ড সামাজিক এবং বুদ্ধিমান প্রাণী। আমার মনে আছে, আশির দশকে একবার আমাদের গলির এক গাছের ডালে একটা কাক কারেন্টের তারে লেগে মারা গিয়েছিল। ব্যস, আধঘণ্টার মধ্যে কোথা থেকে যে হাজার হাজার কাক এসে আকাশ কালো করে ফেলল! তারা সমস্বরে এমন চিৎকার শুরু করল যে আমাদের কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। ওটা ছিল ওদের শোকসভা। কাকের সেই একতা, সেই সামাজিকতার দৃশ্য এখনকার মানুষের মধ্যেও আর দেখা যায় না। এখন গলিগুলো নিঝুম, কাকেরাও আর জটলা পাকায় না।’’
পুরান ঢাকায় সূত্রাপুর থানার মিলব্যারাক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা মিসেস জাহানারা খাতুন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘তখন তো এরকম ফ্রিজ ছিল না। রাতের বাসি ভাত, তরকারির উচ্ছিষ্ট কিংবা মাছ কাটার পর ভেতরের ময়লাগুলো আমরা উঠোনের এক কোণায় ফেলে দিতাম। আর ফেলা মাত্রই আকাশ থেকে চার-পাঁচটা কাক এসে সেকেন্ডের মধ্যে ওগুলো সাবাড় করে দিত। আমরা ওদের আদর করে ‘মেথর পাখি’ বলতাম। ওরা আমাদের চারপাশটা পরিষ্কার রাখত। এখন চারদিকে শুধু প্লাস্টিকের জঞ্জাল আর পলিথিনের প্যাকেট। কাকেরাও বোধহয় এই বিষাক্ত খাবার খেয়ে মরে গেছে, নয়তো এই শহর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।’’
রাজধানীর ফুসফুসখ্যাত রমনা পার্কে প্রতিদিন সকালে হাঁটেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আফসার আলী খাঁন। তিনি বলেন, ‘‘২০১৫-১৬ সালের দিকেও যখন আমি এখানে আসতাম, খাবার দিলে দাঁড়কাকের দল আকাশ কালো করে ঝাঁক বেঁধে নেমে আসত। আমার হাতের দিকে চেয়ে থাকত, কেউ কেউ তো গায়ের ওপর এসেও বসত। আর এখন? আঙুলে গোনা চার-পাঁচটা পাতি কাক আসে। বড় জাতের কুচকুচে কালো দাঁড়কাক তো গত দুই-তিন বছরে একটাও চোখে পড়েনি। বড় একা লাগে এখন এই পার্কে আসলে। মানুষ যেমন শান্তিতে বাঁচতে ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছে, পাখিরাও মনে হয় বাঁচতে ঢাকার বাইরে চলে গেছে।’’
পাখিবিদ ও জীববৈচিত্র্য গবেষকদের মতে, ঢাকায় প্রধানত দুই ধরনের কাকের বিচরণ ছিল ‘পাতি কাক’ এবং আকারে কিছুটা বড়, কুচকুচে কালো ও গম্ভীর কণ্ঠের ‘দাঁড়কাক’। পাতি কাকের ঘাড় ও বুক কিছুটা ধূসর হলেও দাঁড়কাক পা থেকে ঠোঁট পর্যন্ত কুচকুচে কালো এবং এদের ঠোঁট হয় বেশ শক্ত ও বাঁকানো।
ঢাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে মারাত্মক ধাক্কাটি লেগেছে এই রাজকীয় দাঁড়কাকদের ওপর। এরা মূলত লোকালয় থেকে একটু দূরে, বড় বড় গাছের মগডালে বা কোটরে একান্তে বাসা বাঁধতে পছন্দ করে। কিন্তু বিগত দুই দশকে ঢাকার রূপান্তরের দিকে তাকালে দেখা যাবে নগরায়ণ আর উন্নয়নের নামে রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক কিংবা বোটানিক্যাল গার্ডেনের শতবর্ষী বিশাল গাছগুলো নির্মমভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। একের পর এক পুকুর, খাল ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে চোখ ধাঁধানো বহুতল ভবন।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে; দাঁড়কাকদের বাসা বাঁধার চেনা আদিম ঠিকানাগুলো রাতারাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আধুনিক কাঁচের দেয়াল আর কংক্রিটের ফ্ল্যাটে তো আর পাখির বাসা বাঁধার কোনো সুযোগ নেই। তার ওপর যোগ হয়েছে তীব্র শব্দদূষণ এবং মোবাইল টাওয়ারের হাই-ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন, যা এই পাখিদের প্রজনন ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার প্রতিটিরই মূল সুর কাক কমে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি একটি শহরের মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ। কাক হলো প্রকৃতির ‘ন্যাচারাল সুইপার’। একটি মেগাসিটিতে প্রতিদিন যে পরিমাণ জৈব বর্জ্য তৈরি হয়, তার একটা বড় অংশ প্রাকৃতিকভাবে ধ্বংস করে কাক। কাক না থাকলে শহরে ইঁদুর, মশা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের উপদ্রব জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। ঢাকা শহরে এখন ডেঙ্গু বা নানাবিধ জীবাণুবাহিত রোগের যে প্রকোপ, তার পেছনে এই প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনুপস্থিতিও অন্যতম বড় কারণ।
ঢাকা থেকে কাকের এই আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া এবং দাঁড়কাক বিলুপ্ত হওয়ার বিষয়টিকে পরিবেশের এক চূড়ান্ত অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশকর্মী আমিরুল রাজিব বলেন, ‘‘কাক কমে যাওয়া মানে এই শহরটি তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। ঢাকা শহরে কাক কমে যাওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ তীব্র আবাসন সংকট এবং খাদ্যের মারাত্মক গুণগত পরিবর্তন। আগে মানুষ যে উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলত, তা ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। কিন্তু এখন ঢাকার ডাস্টবিনগুলো প্লাস্টিক, পলিথিন, ক্ষতিকর কেমিক্যাল আর প্রক্রিয়াজাত খাবারের জঞ্জালে ভরা। এই বিষাক্ত বর্জ্য খেয়ে কাকেরা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে।’’
‘‘দাঁড়কাকের মতো সংবেদনশীল পাখিরা নগরের এই মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ এবং কংক্রিটের তৈরি কৃত্রিম উত্তাপ সহ্য করতে পারে না। তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারছে না। ঢাকা থেকে কাকের হারিয়ে যাওয়া আমাদের পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে যে এই শহরটি দ্রুত মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এটা প্রকৃতির এক নীরব কিন্তু চরম হুঁশিয়ারি।’’ এখনই আমাদের সাবধান হতে হবে বলেন আমিরুল রাজিব।