বিশ্বজুড়ে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইলেকট্রিক ভেহিকল বা ইভি) দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোও এখন পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে নজর দিচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে এগোচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে ইলেক্ট্রিক বাস চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, যা দেশের পরিবহন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই পেট্রল ও ডিজেলচালিত যানবাহনের জায়গা দখল করবে বৈদ্যুতিক গাড়ি। তাই এখন থেকেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সুফল পেতে পারে।
কেন বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির গুরুত্ব? বৈদ্যুতিক গাড়ি সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে না। ফলে চলার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হয় না। একই সঙ্গে মোটরের মাধ্যমে চলায় শব্দও তুলনামূলক কম সৃষ্টি হয়। নগর এলাকায় বায়ু ও শব্দদূষণ কমাতে তাই ইভি একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি ছোট আকারের স্থানীয়ভাবে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ির উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে মধ্যবিত্ত মানুষের কাছেও এই প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য হতে পারে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রধান সুবিধা
১. পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ইভি থেকে সরাসরি ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ না হওয়ায় শহরের বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায়ও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
২. জ্বালানি খরচে সাশ্রয় পেট্রল বা ডিজেলের তুলনায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গাড়ি চালানোর খরচ অনেক কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীরা উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় করতে পারেন।
৩. রক্ষণাবেক্ষণ সহজ ইঞ্জিন অয়েল, ফুয়েল ফিল্টার বা জটিল যান্ত্রিক অংশ কম থাকায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের খরচও তুলনামূলকভাবে কম হয়।
৪. আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা বেশির ভাগ বৈদ্যুতিক গাড়িতে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্মার্ট ডিসপ্লে, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় পার্কিং, উন্নত কানেক্টিভিটি এবং সফটওয়্যারভিত্তিক নানা সুবিধা যুক্ত থাকে।
৫. কম শব্দ ইঞ্জিনের বদলে বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহারের কারণে গাড়ি প্রায় নিঃশব্দে চলতে পারে, যা শহরের শব্দদূষণ কমাতে সহায়ক।
৬. শক্তির পুনর্ব্যবহার অনেক বৈদ্যুতিক গাড়িতে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং প্রযুক্তি থাকে, যেখানে ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তি আবার ব্যাটারিতে সঞ্চিত হয়। এতে শক্তির অপচয় কমে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির সীমাবদ্ধতা ১. উচ্চ ক্রয়মূল্য বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় বেশি। ব্যাটারির উচ্চমূল্য এর অন্যতম কারণ।
২. নিবন্ধন ও করসংক্রান্ত ব্যয় বাংলাদেশে মোটরের ক্ষমতার ভিত্তিতে নিবন্ধন ফি নির্ধারণের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি হয়ে যায়।
৩. চার্জিং অবকাঠামোর অভাব দেশজুড়ে পর্যাপ্ত পাবলিক চার্জিং স্টেশন না থাকায় দূরপাল্লার ভ্রমণে ব্যবহারকারীরা উদ্বেগে থাকেন। এই অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
৪. চার্জ হতে সময় লাগে দ্রুত চার্জিং সুবিধা না থাকলে একটি গাড়ি সম্পূর্ণ চার্জ হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে, যা অনেক ব্যবহারকারীর জন্য অসুবিধাজনক।
৫. বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে চার্জিং ব্যাহত হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ব্যাটারির আয়ু ও প্রতিস্থাপন ব্যয় যদিও আধুনিক ব্যাটারি দীর্ঘদিন টিকে, তবুও নির্দিষ্ট সময় পর তা বদলাতে হয় এবং ব্যাটারি প্রতিস্থাপনের খরচ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা সরকার যদি চার্জিং স্টেশন স্থাপন, কর-সুবিধা, স্থানীয় উৎপাদনে প্রণোদনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করে, তাহলে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে শহরের বায়ু দূষণ ও শব্দ দূষণও হ্রাস পাবে। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং ভবিষ্যতের টেকসই পরিবহনব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশে ইলেক্ট্রিক বাস চালুর সরকারি উদ্যোগ সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করছে। তবে সফল রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন চার্জিং অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং জনসচেতনতা। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বৈদ্যুতিক গাড়ি দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং নগরজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।