স্বাস্থ্য

অশ্বগন্ধার সঙ্গে বন্ধুত্বে লাভ আছে ক্ষতি নেই

ডেস্ক রিপোর্ট : অশ্বগন্ধা, একটু খেয়াল করলে আমাদের আশপাশেই গাছটির অস্তিত্ব আবিস্কার করা অসম্ভব কিছু নয়। অযত্নে-অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই গাছটির রয়েছে অপরিমেয় ভেষজগুণাবলী। জানা না থাকার কারণে আমরা একে তেমন মূল্যায়ণ করি না।

তবে যারা এর সম্পর্কে জানেন, তাদের কাছে এর কদর অমূল্য সম্পদের মতোই। আসুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক এই উপকারী বন্ধু সম্পর্কে কয়েকটি কথা।

গাছের গন্ধ ঘোড়া বা অশ্ব এর মত বলেই সংস্কৃতে এই গাছটিকে অশ্বগন্ধা বলে। বাংলায় ও এর নাম অশ্বগন্ধা। এই গাছ-পাতা সিদ্ধ করলে এমন একটা উৎকট গন্ধ বের হয়, যার গন্ধ ঠিক অশ্বমূত্রের গন্ধের মতো।

এর ইংরেজি নাম Indian Ginseng, ফ্যামিলি Solanaceae, বৈজ্ঞানিক নাম Withania somnifera (L.) Dunal এবং আয়ুর্বেদী নাম বলদা ও বাজিকরি।

Withanine নামক রাসায়নিক উপাদান এই গাছ থেকে আলাদা করার কারণে এই গাছের নামে Withania নামকরণ করা হয়েছে। আর somnifera এসেছে somnifer থেকে যার মানে নিদ্রা আনয়নকারী। মূল এবং পাতা স্নায়ুর বিভিন্ন রোগে ব্যবহৃত হয়।

এটি Solanaceae গোত্রের একটি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এই গাছের বিভিন্ন প্রজাতি ভারত, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্য-সাগরীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়।

গাছগুলি সর্বোচ্চ পাঁচফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর কাণ্ড ধূসর ও লোমযুক্ত।  শাখাগুলো গোলাকার। পাতাতেও লোম থাকে। পাতার অগ্রভাগ মোটা। পাতার গড়ন ডিম্বাকার এবং লম্বাটে। পাতার বৃন্ত বেশ ছোটো। এর ফুল একলিঙ্গিক। ফুলের বহির্বাস ১/৪ ইঞ্চি। পাপড়ির আকার হয়ে থাকে ১/২ ইঞ্চি। ফুলের আকার প্রায় ১/২ ইঞ্চি। এর ফল ১/৩ ইঞ্চি লম্বা। উপরিভাগ চামড়ার মতো শক্ত।  ফল মটরের মতো এবং পাকলে তা লাল বর্ণ ধারণ করে। প্রচুর ফল হয়। এর ফলের গন্ধও অশ্বদেহের মতো। শুকনো ফল বাজারে পুনির ফাটা নামে বিক্রি হয়। গাছটিতে সাধারণত শীতকালে ফুল ও ফল আসে।

এ গাছ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় পাওয়া যায়। অশ্বগন্ধার মূল, পাতা, ফুল, ফল, ছাল, ডাল সবই কোনো না কোনো ঔষধি হিসেবে ব্যবহার হয়। তাহলে এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক এর ঔষধী গুণাগুণ।

শক্তিবর্ধক : এ গাছের রস শক্তিবর্ধক। চলৎ শক্তি, কর্মশক্তি কিংবা ইন্দ্রীয়শক্তি বাড়াতে বিশেষ কার্যকরী অশ্বগন্ধা। শুক্রাণু বাড়াতে অশ্বগন্ধার নাম সুবিদিত।

স্নায়ুবিক রোগ উপশম কারি : অশ্বগন্ধার মূল ও পাতা স্নায়ুবিক বিভিন্ন রোগে উপশম দেয়। দুধ ও ঘিয়ের সঙ্গে পাতা জ্বাল দিয়ে খেলে পুষ্টি পায় শরীর, মস্তিষ্কের উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। ইনসমনিয়ায় ভুগছেন? তবে অশ্বগন্ধা হতে পারে উত্তম দাওয়াই।

অনিদ্রা : ঘুমের প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে এর বহুল ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। ভালো ঘুমের জন্য অশ্বগন্ধা গুঁড়ো চিনিসহ ঘুমানোর আগে খেতে পারেন। নিদ্রা আনয়নকারী ওষুধ হিসেবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া এবং মিশরে এর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

ঠাণ্ডা-কাশি : ঠাণ্ডা-কাশি থেকে মুক্তি পেতে অশ্বগন্ধার মূল গুঁড়ো করে সেবন করলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়।

চোখ ব্যথা : চোখের প্রদাহ দূরে রাখতে এর পাতা বিশেষ উপকারী। 

ক্রনিক ব্রংকাইটিস : অনেকে অনেক রোগে ভেলকিবাজি দেখিয়ে থাকেন। এটিও ক্রনিক ব্রংকাইটিসে ভেলকিবাজি দেখানোর মতো একটি ওষুধ। এ রোগ হলে রোগী ক্রমাগত কাশতেই থাকে। কিন্তু কফ বা সর্দি ওঠার কোনো নাম-গন্ধও থাকে না। এ রোগে অশ্বগন্ধার মূল অন্তর্ধুমে পুড়িয়ে (ছোট মাটির হাঁড়িতে মূলগুলো ভরে সরা দিয়ে ঢেকে পুনঃমাটি লেপে শুকিয়ে ঘুটের আগুনে পুড়ে নিতে হয়। আগুন নিভে গেলে হাঁড়ি থেকে মূলগুলো বের করে গুঁড়ো করে নিতে হয়) ভালো করে গুঁড়ো করে নিয়ে আধা গ্রাম মাত্রায় একটু মধুসহ চেটে খেতে হয়।

পোড়া স্থান উপশমে : পুড়ে যাওয়া স্থানে জ্বালাযন্ত্রণা উপশম করে। 

মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতা : মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতা যেমন- মাথা ঝিমঝিম করে ওঠা, সংজ্ঞাহীনতা, অবসাদ প্রভৃতি দূর করে অশ্বগন্ধা। মনোযোগ বাড়ায়। ক্লান্তি দূর করে সঞ্জীবনী শক্তি পুনরুদ্ধার করে। 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা : রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় অশ্বগন্ধা। এ ছাড়া বুড়িয়ে যাওয়া, হাইপারটেনশন, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিস দূরে ঠেলে দেয়। একইসঙ্গে বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা কাটাতেও সহায়তা করে। 

বমি উপম করে : অশ্বগন্ধার ফল বমি দূর করে। 

অ্যাসিডিটি : অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা এবং পেটের ব্যথা নিরাময়সহ যকৃতের জন্য ভীষণ উপকারী এর ফল। হজমের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে অশোধিত অশ্বগন্ধা গুঁড়ো বা পাউডার হজমে গোলমাল সৃষ্টি করে। এর ফলে তলপেটে ব্যথা উঠতে পারে। সুতরাং যাদের হজমশক্তি দুর্বল, তাদের অবশ্যই ভালো মানের অশ্বগন্ধা সেবন করতে হবে। 

এ ছাড়া অশ্বগন্ধার মূল ও পাতা অজীর্ণ দূর করে। এটি কৃমিনাশক হিসেবেও কাজ করে। মূত্রনালির সমস্যায় ভুগে থাকলে অশ্বগন্ধা হতে পারে চমৎকার দাওয়াই।

সুতরাং এই চমৎকার এবং উপকারী বন্ধুর সঙ্গে আগে পরিচয় না থাকলে আজই পরিচিত হয়ে নিন। একটু জানা থাকলে নিজেই সারাতে পারবেন নিজের অনেক রোগ। তা ছাড়া হাতের কাছে উপকারী ভেষজ গাছগুলো চিনে রাখতেও তো কোনো ক্ষতি নেই।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ আগস্ট ২০১৪/সনি