রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রয়েছে প্রায় দেড়শ রোগী। যার মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি হামে আক্রান্ত শিশু। জানুয়ারি থেকে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলেও মার্চে তা মহামারিতে রূপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ড, বারান্দা এবং বিশেষায়িত ইউনিট সবখানেই হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে।শয্যা সংকটের কারণে অনেক অভিভাবক বারান্দায় বিছানা পেতে সন্তানদের চিকিৎসা করাচ্ছেন।
হাসপাতালের বারান্দায় চার মাস বয়সী শিশু আবদুল্লাহকে নিয়ে বসে আছেন মা শারমিন আক্তার। তিনি জানান, চারদিন আগে শিশুর হঠাৎ জ্বর আসে। পরে শরীরে ঘামাচির মতো দানা দেখা দেয়। সাভারে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জানান, এটি হাম। পরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। “এখানে তিন দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন কিছুটা ভালো আছে,” বলেন তিনি।
একই চিত্র দেখা যায় তিন মাস বয়সী শিশু মাহতাবের ক্ষেত্রেও। মা ডালিয়া বেগম জানান, ছয় দিন আগে শিশুর শরীরে কাঁপুনি শুরু হয় এবং কালচে দাগ দেখা দেয়। মাদারীপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। তিনি বলেন, “এখানে আনার পর অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে চিকিৎসক জানিয়েছেন এখনও শঙ্কামুক্ত নয়।”
আট মাস বয়সী শিশু মণিকে নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রাহেলা মনোয়ার । তিনি বলেন, “দুই দিন আগে মেয়ের শরীর ঘামাচির মতো দানায় ভরে যায়। শিশু হাসপাতালে নেওয়ার পর এখানে পাঠানো হয়েছে। ওয়ার্ডে বেড না পেয়ে বারান্দায় থাকতে হচ্ছে। চিকিৎসা ভালো, তবে পরিবেশ কিছুটা নোংরা।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১৫২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন, যার মধ্যে ১২৭ জনই হামে আক্রান্ত শিশু। গত সপ্তাহে এই সংখ্যা ২২০ জন ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জানুয়ারির শুরুতে অল্পসংখ্যক রোগী আসতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারিতে তা বাড়ে, আর মার্চে এসে পরিস্থিতি মহামারির মতো হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী বাড়ছে।”
তিনি আরো বলেন, “সাধারণত হামে আক্রান্ত শিশু ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে কারো নিউমোনিয়া হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যেতে পারে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “হাম চিকিৎসায় কোনো সংকট নেই। হামকে মহামারি হিসাবে দেখা হচ্ছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রয়েছে এবং চিকিৎসক ও নার্সেরও ঘাটতি নেই। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিক হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।”
দেশে হঠাৎ হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ার কারণ সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “হামের বর্তমান বিস্তারের প্রধান কারণ হলো টিকার ঘাটতি। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও দ্রুত সংক্রমণশীল একটি রোগ; একজন আক্রান্ত হলে সহজেই বহুজন এতে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে নির্ধারিত হারে টিকাদান না হলে কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়, আর তাদের মধ্যে কেউ আক্রান্ত হলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
তিনি আরও জানান, হামের টিকা সাধারণত নয় মাস বয়সে দেওয়া শুরু হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই টিকার প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে। এজন্য ছয় থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি দেখা দেয়, বিশেষ করে যদি ওই এলাকায় ভাইরাস সক্রিয় থাকে।”
তিন থেকে সাত মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “জন্মের পর মা থেকে যে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা শিশুর শরীরে যাওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছায় না। ফলে নয় মাসের আগেই তারা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। যদিও এ বয়সে সংক্রমণ তুলনামূলক কম তীব্র হতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির কারণেই এসব শিশু বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। দ্রুত টিকাদান জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।”