আন্তর্জাতিক

রমজানে ইয়েমেনের দুর্ভোগ যুদ্ধ, বন্যা, কলেরা আর করোনাভাইরাস

মুসলমানদের কাছে ঈদের আনন্দবার্তা নিয়ে আসে রমজান। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের মানুষের কাছে গত পাঁচ বছর কোনো আনন্দ আসেনি। এবারের রমজানে দেশটিতে সৌদি জোটের বিমান হামলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্যা, কলেরা আর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ।

ইয়েমেনের মানুষদের জন্য দুর্ভোগের এখানেই শেষ নয়। জাতিসংঘের বদৌলতে হতদরিদ্র দেশটির মানুষ যে ত্রাণের ওপর টিকে ছিল তাও এবার বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দাতা দেশ ইয়েমেনে জাতিসংঘের সহায়তা প্রকল্পে অনুদান দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষ এই ত্রাণের ওপর নির্ভর করে।

২০১৫ সাল থেকে ইরান সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি জোট। আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াইয়ে বলি হয়েছে দেশটির কয়েক কোটি মানুষ। পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৩০ লাখ মানুষ। জরুর স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মুখে ২ কোটি মানুষ। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে গত এপ্রিলে সৌদি কর্তৃপক্ষ দয়া করে হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে পবিত্র রমজানেও সেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে কয়েকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থা হুতি এলাকাগুলোতে থাকা ৯৬ লাখ বাসিন্দাকে খাদ্য সহায়তা দেয়। অনুদান সংকটের কারণে সংস্থাটিকে ইতোমধ্যে প্রতি মাসে খাদ্য সহায়তা অর্ধেক কমিয়ে দিতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই  এক কোটি লোককে অনাহারের দ্বারপ্রান্তে বাস করতে হচ্ছে।

যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহযোগিতার বদৌলতে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটের বোমা হামলায় ইয়েমেনের অর্ধেক চিকিৎসা কেন্দ্রই ধ্বংস হয়ে গেছে। যেগুলো টিকে আছে সেগুলোতে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন দিতে হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য  সংস্থাকে। তবে গত সপ্তাহে ১২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান স্বল্পতার কারণ সেই বেতন দেওয়া বন্ধ করে দিতে হয়েছে সংস্থাটিকে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল ইয়েমেনে তাদের কার্যক্রম চালাতে যে অনুদান চলতি বছর প্রয়োজন পড়বে তার মাত্র ৪১ শতাংশ মিলেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তহবিল না পাওয়া গেলে ১৪০টি প্রসূতি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে ঝুঁকিতে পড়বে ৪৮ হাজার প্রসূতি নারী।

এপ্রিল থেকে দেশটিতে শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুম। ব্যাপক বন্যার সঙ্গে শুরু হয়েছে কলেরার প্রাদুর্ভাব। ইতোমধ্যে কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইয়েমেনি ত্রাণকর্মী বলেন, এটি সহায়তা প্রকল্প ও ত্রাণ বন্ধ করে দেওয়ার মতো সঠিক সময় নয়। তারা যদি হুতিদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে তাহলে এটি কাজ করবে না। কারণ ইতোমধ্যে তারা দেখেছে হুতিরা কোথাও যাচ্ছে না। ভুগবে কেবল সাধারণ মানুষ।’

সানায় আন্তর্জাতিক রেডক্রস প্রতিনিধির প্রধান ফ্রাঞ্জ রাউচেনস্টেইন বলেন, ‘ইয়েমেনিদের প্রতিদিন অত্যন্ত কষ্টের দিন পার করতে হয়। চলমান যুদ্ধের কারণে দেশটির নিত্যদিনের স্বাভাবিক জীবন উধাও হয়ে গেছে, মৌসুমি সংক্রামক রোগ প্রতি বছর হাজার হাজার প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এবং অতি মুদ্রাস্ফিতির প্রভাব পড়েছে খাদ্যমূল্য, ওষুধ ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ওপর। কোভিড-১৯ এই অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর আরেকটি উদ্বেগ হয়ে চেপে বসেছে।’

গত পাঁচ বছর ধরে বিশ্ববাসী ইয়েমেনের মানুষদের দুর্ভোগ দেখছে টেলিভিশনের পর্দায়। এই দুর্ভোগ দেখে কেউ হয়তো দুঃখে বড়জোর উহ, আহ্ শব্দ করেছে। কিন্তু ইয়েমেনিদের এই যন্ত্রণা লাঘবের উদ্যোগ নেয়নি কোনো দেশ। তাই আজ যখন করোনা সংকটে সারাবিশ্বের ত্রাহি দশা তখন অনেক ইয়েমেনি একে তাদের দেওয়া অভিশাপের ফল বলেই মনে করছেন।

রাজধানী সানার মুদি দোকানি ধাফের মুরাদ বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে ইয়েমেন ভুগছে এবং সারা বিশ্ব টেলিভিশনে আমাদের দুর্ভোগ দেখছে। কিন্তু আজ উল্টো ঘটনা ঘটছে। আমরা তো দুর্ভোগকে মেনে নিয়েছি এবং দেখছি সারাবিশ্ব করোনাভাইরাসে ভুগছে।’ ঢাকা/শাহেদ