টানা জনসংখ্যা হ্রাস মোকাবিলায় গর্ভনিরোধক সামগ্রীর ওপর ১৩ শতাংশ বিক্রয় কর আরোপ করেছে চীন সরকার। গত বছরের শেষের দিকে ঘোষিত নতুন এই নীতিটি আজ ১ জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে দেশটিতে কার্যকর করা হয়েছে। খবর বিবিসির।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন ২০১৫ সালে তাদের বির্তকিত ‘এক সন্তান নীতি’ বাতিলের পর থেকেই জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ঘোষিত সর্বশেষ নিয়মে একদিকে যেমন গর্ভনিরোধক সামগ্রীর ওপর বিক্রয় কর আরোপ করা হয়েছে, অন্যদিকে শিশু যত্ন বা চাইল্ডকেয়ার পরিষেবাগুলোকে কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নিয়মে বিয়ে-সংক্রান্ত পরিষেবা এবং বয়স্কদের যত্ন নেওয়ার বিষয়গুলোকেও ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত সন্তান জন্মদানের জন্য দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং নগদ অর্থ সহায়তার মতো বেইজিংয়ের বিস্তৃত প্রচেষ্টারই একটি অংশ।
ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যা এবং ধীরগতির অর্থনীতির মুখে বেইজিং তরুণদের বিয়ে করতে এবং দম্পতিদের সন্তান নিতে উৎসাহিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টানা তিন বছর ধরে চীনের জনসংখ্যা কমছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৯.৫৪ মিলিয়ন শিশু জন্ম নিয়েছে, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এক দশক আগে থেকেই চীন তাদের সন্তান ধারণের সীমাবদ্ধতা শিথিল করতে শুরু করেছিল।
এদিকে, কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল এবং অন্যান্য সরঞ্জামের ওপর এই কর আরোপ অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং এইচআইভি সংক্রমণের হার বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে হাস্যরসেরও সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সন্তান পালনের খরচের তুলনায় দামী কনডম মানুষকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
বেইজিংয়ের ইউওয়া পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন শিশু লালন-পালনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল দেশ। উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে স্কুলের ফি এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য মাতৃত্ব ও কর্মক্ষেত্রের ভারসাম্য রক্ষা করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্পত্তি খাতের সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ে আঘাত হেনেছে। ফলে পরিবারগুলো, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
হেনান প্রদেশের ৩৬ বছর বয়সী ড্যানিয়েল লুও বলেন, “আমার একটি সন্তান আছে এবং আমি আর চাই না।” তিনি কনডমের দাম বৃদ্ধি নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তার ভাষ্য, “এক বক্স কনডমের দাম হয়তো ৫ ইউয়ান বা বড়জোর ২০ ইউয়ান বাড়বে। বছরে যা কয়েকশ ইউয়ান মাত্র, যা বহনযোগ্য।”
তবে শি’আন শহরের বাসিন্দা রোজি ঝাও মনে করেন, অন্যদের জন্য এই খরচ সমস্যার কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, গর্ভনিরোধক একটি মৌলিক প্রয়োজন, এর দাম বেড়ে গেলে শিক্ষার্থী বা আর্থিকভাবে অসচ্ছলরা ‘ঝুঁকি নিতে’ পারে। তার মতে, এটিই এই নীতির ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক ফলাফল’ হতে পারে।
পর্যবেক্ষকরা কর ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভক্ত। উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেমোগ্রাফার ই ফুসিয়ান বলেন, কনডমের ওপর কর বাড়িয়ে জন্মহার বাড়ানো যাবে- এমন চিন্তা করা ‘বাড়াবাড়ি’। তিনি বিশ্বাস করেন, আবাসন খাতের মন্দা এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণের কারণে বেইজিং যেখানেই পারছে সেখান থেকেই কর সংগ্রহ করতে চাইছে।
গত বছর চীনের মোট কর আদায়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছে ভ্যাট থেকে, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হেনরিয়েটা লেভিন বলেন, কনডমের ওপর কর আরোপের বিষয়টি মূলত ‘প্রতীকী’। এটি চীনের খুব নিম্ন প্রজনন হার বৃদ্ধিতে বেইজিংয়ের প্রচেষ্টারই একটি প্রতিফলন।
লেভিন আরো বলেন, ব্যক্তিগত পছন্দে সরকার ‘অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ’ করছে এমন মনে হলে চীনের এই উদ্যোগ হিতে বিপরীত হতে পারে। সম্প্রতি খবর পাওয়া গেছে যে, কিছু প্রদেশে সরকারি কর্মকর্তারা নারীদের ফোন করে তাদের ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড চক্র এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। ইউনান প্রদেশের স্বাস্থ্য ব্যুরো জানিয়েছে, গর্ভবতী মায়েদের শনাক্ত করার জন্য এই তথ্যের প্রয়োজন ছিল।
লেভিন বলেন, “এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদেরই শত্রুতে পরিণত করে।”
পর্যবেক্ষক এবং খোদ নারীরা বলছেন, চীনের পুরুষতান্ত্রিক নেতৃত্ব সামাজিক পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। পশ্চিমের দেশগুলো এমনকি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো এশীয় দেশগুলোও বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জন্মহার বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এর অন্যতম কারণ হলো শিশু যত্নের পুরো ভার নারীদের ওপর পড়া। এছাড়া বিয়ে এবং ডেটিং-এর প্রতি অনীহাও একটি বড় কারণ।
হেনান প্রদেশের লুও মনে করেন, চীনের এই পদক্ষেপগুলো আসল সমস্যাটি এড়িয়ে যাচ্ছে। আধুনিক তরুণদের মধ্যে সত্যিকারের মানবিক সংযোগের অভাব দেখা দিচ্ছে। তিনি চীনে সেক্স টয় বা যৌন সামগ্রীর ক্রমবর্ধমান বিক্রির কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি একটি লক্ষণ যে ‘মানুষ নিজের মধ্যেই তুষ্ট থাকছে’, কারণ ‘অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এখন একটি বাড়তি খরচের চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”