আন্তর্জাতিক

মিয়ানমারে বিতর্কিত নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ শুরু

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রবিবার (১১ জানুয়ারি) জাতীয় নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ শুরু করেছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রবল সংশয়ের মধ্যেই এই ভোটগ্রহণ চলছে। 

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, দেশটিতে এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

মিয়ানমার শাসনকারী জান্তা সরকার বলছে, এই নির্বাচন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটির জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি নতুন শুরুর সুযোগ।

থাইল্যান্ডে নির্বাসিত মিয়ানমার নাগরিকদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ‘ইরাবতী’ রবিবার (১১ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে বলেছে, গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, বেসামরিক শাসনের ছদ্মবেশে সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করতেই এই নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।

মিয়ানমার তার স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় সশস্ত্র বাহিনীর শাসনে ছিল। এরপর এক দশকের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময় সংস্কারের জোয়ারে বেসামরিক প্রতিনিধিরা শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী পুনরায় ক্ষমতা দখল করে। তারা পূর্ববর্তী নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে দেয়, গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চি-কে আটক করে এবং দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

ভোটের চিত্র ও বর্তমান পরিস্থিতি

রবিবার সকাল ৬টায় ইয়াঙ্গুন শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অং সান সু চির সাবেক নির্বাচনী এলাকা কাওহমু-তে ভোট গ্রহণ শুরু হয়।

গত পাঁচ বছর বলপ্রয়োগ করে শাসনের পর জান্তা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তিন ধাপের এই নির্বাচন (যা ২৫ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা) জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে।

গত মাসের শেষে অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর ছায়া দল হিসেবে পরিচিত ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নিম্নকক্ষের প্রায় ৯০ শতাংশ আসনে জয়লাভ করেছে।

‘সাজানো’ নির্বাচনের অভিযোগ

অং সান সু চি-কে অবরুদ্ধ রাখা এবং তার জনপ্রিয় দলটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করায় গণতন্ত্রপন্থিরা এই ভোটকে ‘কারচুপির নির্বাচন’ বলে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, ব্যালট পেপারগুলো সামরিক বাহিনীর মিত্রদের দিয়ে সাজানো এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইয়াঙ্গুনের এক বাসিন্দা বলেন, “নির্বাচনের ফলাফল সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েই আছে। এই নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে এই ভোটের কোনো সম্পর্ক নেই।”

বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা বড় এলাকাগুলোতে কোনো ভোট গ্রহণ হচ্ছে না। জান্তা সরকার অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের প্রথম ধাপের সপ্তাহান্তে বিদ্রোহীরা ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করেছে।

থাইল্যান্ডের কাসেতসার্ট ইউনিভার্সিটির মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ ললিতা হানওং-এর মতে, এই নির্বাচনে সামরিক বাহিনী ঘনিষ্ঠ ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)’ পুনরায় ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। কারণ মোট প্রার্থীদের এক-পঞ্চমাংশই এই দলের এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

তিনি বলেন, “জান্তার এই নির্বাচন মূলত জনগণের ওপর সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার জন্য নকশা করা হয়েছে। ইউএসডিপি এবং সামরিক বাহিনীর মিত্র অন্যান্য দলগুলো একজোট হয়ে পরবর্তী সরকার গঠন করবে।”

বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা

বিশ্লেষকদের মতে, জান্তা এই নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চাইছে, যাতে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। জাতিসংঘ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ টম অ্যান্ড্রুজ এক বিবৃতিতে বলেন, “জান্তা এই নির্বাচন এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে তাদের মনোনীত প্রক্সি দল জয়ী হয় এবং সহিংসতার মধ্যেই একটি বৈধতার মুখোশ তৈরি করা যায়।”

সামরিক আধিপত্য

জান্তার জারি করা আইনের আওতায় অন্তত ৩৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, যেখানে নির্বাচনের সমালোচনা করলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমানে মিয়ানমারে জান্তাশাসিত কারাগারগুলোতে ২২ হাজারেও বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন।

নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, আগের সামরিক আমলের সংবিধান অনুযায়ী সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে।