যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহের প্রতিক্রিয়ায় দ্বীপটির প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার চেয়ে স্বশাসিত এই অঞ্চলটি ডেনমার্কের সঙ্গেই থাকতে চায়। খবর বিবিসির।
কোপেনহেগেনে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নিলসেন বলেন, “আমরা এখন একটি ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। যদি আমাদের এখনই যুক্তরাষ্ট্র এবং ডেনমার্কের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয়, তাহলে আমরা ডেনমার্ককেই নেব।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আনার পর থেকে আধা-স্বায়ত্তশাসিত এই ডেনিশ অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধির পক্ষ থেকে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য।
ট্রাম্পের মতে, রাশিয়া এবং চীনের হাত থেকে রক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড ‘মালিকানা’ থাকা প্রয়োজন। হোয়াইট হাউজ বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে এটি দখল করার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি।
ডেনমার্ক পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখল করলে তা ন্যাটো জোটের সমাপ্তি ঘটাবে।
মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) নিলসেনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, “সেটা তাদের সমস্যা, আমি তার সঙ্গে একমত নই... এটা তার জন্য একটা বড় সমস্যা হতে যাচ্ছে।”
বিশ্বের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও, উত্তর আমেরিকা ও উত্তর মেরুর (আর্কটিক) মাঝে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান একে খুবই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারির জন্য দ্বীপটি কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।
ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি অভিযোগ করেন, অঞ্চলটি ‘রাশিয়া এবং চীনের জাহাজে সয়লাব হয়ে আছে।’
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে পিটুফিক ঘাঁটিতে শতাধিক মার্কিন সেনা স্থায়ীভাবে মোতায়েন রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এই ঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে গ্রিনল্যান্ডে যেকোনো সংখ্যক সেনা মোতায়েন করতে পারে।
তবে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, কেবল ইজারা (লিজ) চুক্তি যথেষ্ট নয়- যুক্তরাষ্ট্রকে এটার ‘মালিকানা পেতে হবে’ এবং ‘ন্যাটোকে তা বুঝতে হবে’।
কোপেনহেগেনের সংবাদ সম্মেলনে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী কোনো রাখঢাক না করেই তাদের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের’ পক্ষ থেকে আসা এই ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য চাপের’ নিন্দা জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, “অনেক লক্ষণই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সবচেয়ে কঠিন সময়টি এখনো সামনে পড়ে আছে।”
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। যদি আমাদের এখনই যুক্তরাষ্ট্র এবং ডেনমার্কের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়, তবে আমরা ডেনমার্ককেই বেছে নেব। একটি বিষয় সবার কাছে পরিষ্কার হওয়া উচিত- গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন হতে চায় না। গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা শাসিত হতে চায় না। গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।”
কোপেনহেগেনের এই সংবাদ সম্মেলনটি এমন সময়ে হলো যখন ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ড যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে দেখা করতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা রয়েছে।
ডেনমার্কের ন্যাটো মিত্ররা- বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং কানাডা- এই সপ্তাহে ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছে, “কেবল ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডই তাদের সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
গত শনিবার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘অপহরণ’ করার জন্য ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার পর গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়ে গেছে। এর আগে ২০১৯ সালে নিজের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদেও ট্রাম্প দ্বীপটি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তখন তাকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছিল যে, এটি বিক্রির জন্য নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি বিশ্বের আগ্রহ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে যাওয়ায় সেখানে থাকা বিরল খনিজ পদার্থ, ইউরেনিয়াম এবং লোহা উত্তোলন সহজ হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সেখানে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস মজুত থাকতে পারে।