আন্তর্জাতিক

৪০ বছরের ক্ষমতা ধরে রাখতে চান মুসেভেনি, উগান্ডায় ইন্টারনেট বন্ধ

উগান্ডায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুইদিন আগে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবারের নির্বাচনের সময় প্রেসিডেন্ট ইয়োভেরি মুসেভেনি তার ৪০ বছরের শাসনকাল আরো বাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তার বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ উঠেছে।  

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে চীনের সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, উগান্ডার ৮১ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে সপ্তমবারের মতো দেশটির ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছেন। 

একসময় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব নেওয়া মুসেভিনি ১৯৮৬ সালে প্রথম যখন উগান্ডার প্রেসিডেন্ট হোন, তখন তিনি আফ্রিকান শাসকদের দীর্ঘসময় ক্ষমতায় না থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে এরপর মুসেভেনি নিজেই ৪০ বছর ধরে উগান্ডা শাসন করে আসছেন, যার ফলে দেশটির বেশিরভাগ নাগরিক তাদের জীবনে তিনি ছাড়া অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট দেখেনি। 

প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর মুসেভেনির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকায় আগামী বৃহস্পতিবারের (১৫ জানুয়ারি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তার জয় এক প্রকার নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে জনপ্রিয় বিরোধী প্রার্থী ববি ওয়াইনের ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না মুসেভেনি। সংগীতশিল্পী থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া ৪৩ বছর বয়সী ববি ওয়াইনের জনসভাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন সত্ত্বেও মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানী কাম্পালায় মুসেভেনি তার শেষ নির্বাচনী জনসভা করেন। বড় ধরনের এই আয়োজনটি কাভার করতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোকে বাধা দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ হেঁটে কোলোলো ন্যাশনাল সেরিমোনিয়াল গার্ডেনে সমবেত হন। এদের মধ্যে অনেকেই বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান যে, তাদের বাসে করে রাজধানীতে আনা হয়েছে এবং বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়েছে।

সরকারি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও বিদেশি সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয় এবং কাউকে কাউকে গ্রেপ্তারের হুমকিও দেয় নিরাপত্তা বাহিনী।

মানবাধিকার গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের শত শত সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুসেভেনির বিরুদ্ধে চারবার নির্বাচন করা আরেক বিরোধী নেতা কিজা বেসিগয়েকে ২০২৪ সালে কেনিয়া থেকে অপহরণ করে উগান্ডার সামরিক আদালতে হাজির করা হয়, সেখানে এখনো তার বিচার চলছে।

এএফপির সাংবাদিকরা জানান, মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) গ্রিনিচ মান সময় বেলা ৩টার দিকে উগান্ডায় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

উগান্ডা কমিউনিকেশন কমিশন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়ে জানায়, ‘ভুল তথ্য’ এবং ‘সহিংসতায় উসকানি’ রোধ করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। একজন কর্মকর্তা জানান, কেউ এই সিদ্ধান্তের দায়ভার ‘নিজের কাঁধে’ নিতে চাইছেন না বলেই কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

২০২১ সালের গত নির্বাচনেও উগান্ডায় ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। সেই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিযোগ উঠেছিল। অথচ উগান্ডার সরকার এবার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, নির্বাচনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করা হবে না। এমনকি ৫ জানুয়ারি এক্স-এ এক পোস্টে তারা জানিয়েছিল, ইন্টারনেট বন্ধের দাবিগুলো ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’।

প্রতিবেশী দেশ তানজানিয়াও গত অক্টোবরে নির্বাচনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছিল, যার ফলে কারচুপির অভিযোগে সেখানে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়। বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে সেখানে শত শত বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিল।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) কাম্পালায় মুসেভেনির বিশাল জনসভায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে মুসেভেনির একটি যান্ত্রিক ম্যাসকট ব্যবহার করা হয় যা হাত নেড়ে জনতাকে অভিবাদন জানাচ্ছিল।

৪১ বছর বয়সী বানুরা অলিভার বলেন, আশির দশকে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি প্রেসিডেন্টকে ভোট দেবেন। তিনি বলেন, “৪০ বছর কোনো বিষয় নয়, আমাদের তাকে আরো প্রয়োজন।” বিরোধী প্রার্থী সম্পর্কে তিনি বলেন, “মানুষ যদি ভুল করে এই ছেলেকে ভোট দেয়, তবে আমাদের কষ্ট পেতে হবে। সে ভালো নেতা নয়।”

তবে জনসভায় উপস্থিত অন্যদের কেউ কেউ জানান, তারা কেবল বিনামূল্যে চাল ও মাংসের জন্য এসেছেন এবং মুসেভেনিকে ভোট দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।

২০০৫ সালে উগান্ডার পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদের সীমাবদ্ধতা তুলে দেয়। সমালোচকরা বলছেন, মুসেভেনিকে আজীবন ক্ষমতায় রাখার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফ টিটেকা ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “বয়সজনিত কারণে মুসেভেনি এখন আগের চেয়ে দুর্বল, কিন্তু তিনি খুব কঠোর পরিশ্রমী... তাকে যদি হাঁটার লাঠিও ব্যবহার করতে হয়, তবুও তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।”