আন্তর্জাতিক

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি: ক্ষুব্ধ ইউরোপীয় নেতারা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর বিরোধিতা করায় তিনি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ডেনমার্কসহ আটটি ইউরোপীয় দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। ইউরোপীয় নেতারা এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। 

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপীয় নেতা সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ ট্রান্সআটলান্টিক (ইউরোপ-আমেরিকা) সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘বিপজ্জনক অবনতি’ পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি করছে।

রবিবার (১৮ জানুয়ারি) এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের লক্ষ্যবস্তু হওয়া আটটি দেশ জানায়, তারা ডেনমার্ক ও ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সঙ্গে ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করছে।

ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য তাদের বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, “শুল্কের হুমকি ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি করছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব ও সমন্বিতভাবে এর জবাব দেব। আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

রবিবার ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ‘যেকোনো ধরনের জবরদস্তির বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করতে’ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের অর্থনৈতিক হুমকির জবাবে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে খুব শিগগির আলোচনায় বসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য ইউরোপের বাজারে বিধিনিষেধ।

গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই আটটি দেশকে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ এবং ১ জুন থেকে ২৫ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মার্কিন পণ্যের ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (১০৮ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের শুল্ক আরোপের পাশাপাশি ২০২৩ সালে গৃহীত ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।

এই পদক্ষেপটি এর আগে কখনও নেওয়া হয়নি। এটি কোনো বিদেশী কোম্পানির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে বিনিয়োগে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ও মেধা সম্পত্তি সুরক্ষা প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য কমিটির চেয়ারম্যান জার্মান এমইপি বার্ন্ড ল্যাঞ্জ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতির জন্যই বিশেষভাবে তৈরি করা ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ এখন অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। আমি ইউরোপীয় কমিশনকে অবিলম্বে এই আইন কার্যকর করার আহ্বান জানাই।”

গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান মার্কিন-ইউরোপীয় সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অস্তিত্ব নিয়েও শঙ্কা তৈরি করেছে।

ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেননি। তিনি ৩২ সদস্যের ‘ন্যাটো’ জোট ভেঙে যাওয়ার উদ্বেগকেও পাত্তা দেননি- যেই জোটটি এই নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে, কোনো এক সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ মানেই সবার ওপর আক্রমণ।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ভোরে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্টে ট্রাম্প আবারো গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেওয়ার দৃঢ় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন। তার দাবি, গ্রিনল্যান্ডে রাশিয়ার হুমকির বিরুদ্ধে ডেনমার্ক ‘কিছুই করতে পারেনি’।

ট্রাম্প বলেন, “এখন সময় এসেছে এবং এটি করা হবেই!!!”

ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ড বিক্রি করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জনমত জরিপ বলছে যে, দ্বীপটির ৫৭ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।

শনিবার ডেনমার্কের শহরগুলোতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসেন। তারা ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়’ বলে স্লোগান দেন এবং ‘গ্রিনল্যান্ড থেকে হাত সরাও’ লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেন।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন এই ‘শক্তিশালী সমর্থনের’ জন্য দেশের মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমরা সহযোগিতা চাই এবং আমরা কোনো সংঘাত চাইছি না। আমি মহাদেশের বাকি দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থনের বার্তায় আনন্দিত। ইউরোপকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না।”

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো বলেন, ‘কোনো ভীতি প্রদর্শন বা হুমকি’ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার সরকারের অবস্থানে প্রভাব ফেলবে না।

ম্যাঁখো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, “শুল্কের হুমকি গ্রহণযোগ্য নয়। শুল্ক কার্যকর করা হলে ইউরোপীয়রা ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে এর জবাব দেবে। আমরা নিশ্চিত করব যেন ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে।”

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকিকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ কাজ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই এই বিষয়টি সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করব।”