আন্তর্জাতিক

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে পেছনে ফেরার পথ নেই: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যাপারে তার হুমকিতে অনড় রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, আর্কটিক অঞ্চলের এই বিশাল দ্বীপটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেয়ার লক্ষ্য থেকে ‘পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই’ এবং ‍‘গ্রিনল্যান্ড (যুক্তরাষ্ট্রের জন্য) অপরিহার্য’।

বুধবার (২১ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

মঙ্গলবার (২০ ডিসেম্বর) হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে সংবাদিকরা যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে জানতে চান গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি কতদূর যেতে রাজি- জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আপনারা খুব শিগগির তা জানতে পারবেন।”

এদিকে, সুইজারল্যান্ডের দাভোস-এ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো ‘নিয়মহীন বিশ্বের দিকে ধাবিত হওয়া’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি-ও।

বুধবার ট্রাম্পের দাভোস পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, সেখানে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার ‘অনেকগুলো বৈঠক নির্ধারিত আছে’।

দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ‘সবকিছু বেশ ভালোভাবেই মিটে যাবে’।

গ্রিনল্যান্ড পাওয়ার বিনিময়ে ন্যাটো জোটের সম্ভাব্য ভাঙন প্রেসিডেন্ট মেনে নেবেন কি না- বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ন্যাটোর জন্য আমার চেয়ে বেশি কাজ আর কেউ করেনি।” তিনি আরো যোগ করেন, “ন্যাটো খুশি হবে এবং আমরাও খুশি হব। বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এটি আমাদের প্রয়োজন।”

তবে এর আগে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, প্রয়োজন পড়লে ন্যাটো আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে কি না। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমি জানি আমরা ন্যাটোকে উদ্ধারে এগিয়ে যাব, কিন্তু তারা আমাদের উদ্ধারে আসবে কি না তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”

বর্তমানে ন্যাটোর সদস্য সংখ্যা ৩২, যার ১২টি প্রতিষ্ঠাতা দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। যৌথ প্রতিরক্ষার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষে গঠিত এই জোটের অন্যতম প্রধান মূলনীতি হলো ‘আর্টিকেল ৫’। যেখানে বলা হয়েছে- কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ মানেই জোটের সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে।

গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও ট্রাম্প উড়িয়ে দেননি। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ যখন তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে যে তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন কি না, প্রেসিডেন্ট জবাবে বলেন, “মন্তব্য নেই।”

মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বিবিসি নিউজনাইট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডের শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী নাজা নাথানিয়েলসেন বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন দাবিতে গ্রিনল্যান্ডবাসী ‘বিস্মিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়’।

নাথানিয়েলসেন বলেন, “আমরা আমেরিকান হতে চাই না এবং আমরা সেটা ইতিমধ্যে পরিষ্কার করেই বলেছি।”

মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বৈঠকের প্রথম দিন ছিল। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন সরাসরি গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়ে ইউরোপ ‘সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, এটি কেবল ঐক্যবদ্ধভাবেই অর্জন সম্ভব এবং ট্রাম্পের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিষয়টিকে তিনি একটি ‘ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিরোধিতা করায় ট্রাম্প সম্প্রতি ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পণ্যে ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট শর্ত দিয়েছেন- গ্রিনল্যান্ড বিক্রির চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বজায় থাকবে।

মঙ্গলবার ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ফন ডার লিয়েন তার বক্তব্যে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের সঙ্গে ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করছে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ‘কোনো আপস করা হবে না’।

তার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর প্রতি তার দেশের প্রতিশ্রুতি ‘অবিচল’। কার্নি বলেন, “আমরা গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছি এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের যে অনন্য অধিকার রয়েছে, তাকে পূর্ণ সমর্থন জানাই।”

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো তার বক্তব্যে বলেন যে, তিনি ‘ধমকবাজির চেয়ে সম্মানকে’ এবং ‘নৃশংসতার চেয়ে আইনের শাসনকে’ প্রাধান্য দেন।

এর আগে মঙ্গলবার, ট্রাম্প ফ্রান্সের ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গাজা ‘বোর্ড অব পিস’ -এ যোগদানের আমন্ত্রণ ম্যাঁখো প্রত্যাখ্যান করার পর ট্রাম্প এই হুমকি দেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের এই হুমকিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন, বিশেষ করে যখন এটি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ম্যাঁখো ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সূত্রের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করার পরিকল্পনা করছে।