আন্তর্জাতিক

বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ের পথে মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত দল

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দেশটির ‘বিতর্কিত’ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আজ রবিবার মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের শেষ দফার ভোটগ্রহণ চলছে। আগের দুই দফার ভোটে সামরিক বাহিনী সমর্থিত দল ইতিমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিশ্চিত করেছে।

রবিবার (২৫ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারে গত ২৮ ডিসেম্বর এবং ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দুই দফার ভোটের পর নিম্নকক্ষের ২০৯টি আসনের মধ্যে ১৯৩টি এবং উচ্চকক্ষের ৭৮টি আসনের মধ্যে ৫২টিতে জয় পেয়েছে জান্তা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। প্রতিটি পর্বে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ, যা ২০১৫ এবং ২০২০ সালের নির্বাচনের (প্রায় ৭০ শতাংশ) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, দেশটিতে এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রধান বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। মোট প্রার্থীদের এক-পঞ্চমাংশই সামরিক বাহিনীর ছায়া দল হিসেবে পরিচিত ইউএসডিপির এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

জাতিসংঘ, বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং যুক্তরাজ্য এই নির্বাচনকে সামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার একটি ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করে এর নিন্দা জানিয়েছে।

গত বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ান-এর সভাপতির দায়িত্বে থাকা মালয়েশিয়া জানিয়েছে, এই জোট মিয়ানমারের এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে না।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও অনুযায়ী, জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটি স্বীকার করল কি করল না, আমরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝি না। জনগণের ভোটই আমাদের প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি।” সামরিক বাহিনীর দাবি, এই নির্বাচন কোনো প্রকার জবরদস্তি ছাড়াই এবং জনসমর্থন নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

রবিবার ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালয়সহ প্রায় ৬০টি উপশহরে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। জান্তা সমর্থিত সংবাদমাধ্যমের ছবিতে দেখা গেছে, ৬৯ বছর বয়সী জেনারেল মিন অং হ্লাইং বেসামরিক পোশাকে মান্দালয়ের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন।

একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, ভারপ্রাপ্ত এই প্রেসিডেন্ট সম্ভবত সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে অন্য কাউকে নিয়োগ দিয়ে নিজে পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক ভূমিকায় আসার কথা বিবেচনা করছেন। ভবিষ্যতে সরকারের নিজের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে মিন অং হ্লাইং বলেন, “সংসদ অধিবেশন শুরু হলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য তাদের নিজস্ব পদ্ধতি ও নিয়ম রয়েছে।”

জান্তা সরকার ভোটার উপস্থিতিকে সফল হিসেবে দাবি করলেও, বড় শহরগুলোর বাসিন্দারা রয়টার্সকে জানান, তারা এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। গ্রেপ্তার বা প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ভয়ে অনেকেই ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন।

ইয়াঙ্গুনের এক বাসিন্দা জানান, সেনা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও অন্যান্য এলাকায় ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ৮০ বছর বয়সী অং সান সু চি বর্তমানে বন্দী রয়েছেন এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)-সহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকে জান্তা সরকার বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে।

ভোট চলাকালেও মিয়ানমারের রাখাইন, শান এবং কায়িন রাজ্যের মতো সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিমান হামলা ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের বিশ্লেষক কাহো ইয়ু বলেন, “এই নির্বাচন চলমান সংকট সমাধানের বদলে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাকেই আরো পোক্ত করবে।”

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সমালোচনা বা বাধার অভিযোগে ‘নির্বাচন সুরক্ষা আইন’ ব্যবহার করে জান্তা সরকার এ পর্যন্ত চার শতাধিক মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।