হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন নৌবহর ‘জেরাল্ড ফোর্ড’ মোতায়েনের হুমকিকে পাত্তাই দিচ্ছে না ইরান।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ মার্কিন নৌবহর ‘জেরাল্ড ফোর্ড’-কে পারস্য উপসাগরে আসার সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের দেখে নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানি বার্তা সংস্থা ওয়ানা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি মুখপাত্র নায়িনি বলেন, মার্কিন নেতা ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়া নিয়ে মিথ্যা দাবি করছেন।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের মিথ্যাবাদী প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের চাপ থেকে বাঁচতে এবং অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর হতাশা কাটাতে মিথ্যা দাবি করেছেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি আরো বলেন, “অপরাধী ট্রাম্প যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর প্রতারণা ও চাতুর্যের মাধ্যমে যুদ্ধে সাফল্য অর্জনের গল্প ফেঁদে জনমতকে বিভ্রান্ত করতে এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে বাঁচতে চাইছেন। আমরা ট্রাম্পের কাছ থেকে মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।”
নায়িনি ট্রাম্পের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন যেখানে বলা হয়েছিল যে, এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে সহজেই পার হচ্ছে।
নায়িনি বলেন, “তিনি (ট্রাম্প) দাবি করেছেন বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজগুলো এই অঞ্চলে উপস্থিত রয়েছে এবং সহজেই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করছে, অথচ বাস্তবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সব বিমান ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাত থেকে বাঁচতে এই অঞ্চল থেকে ১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে সরে গেছে।”
তিনি যোগ করেন, “ট্রাম্পের কাপুরুষ ও ভীতু নৌ-সেনারা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এ চারটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে ১ হাজার কিলোমিটারের বেশি নিয়ে গেছে।”
নায়িনি উল্লেখ করেন, “ট্রাম্প দাবি করেন যে অঞ্চলে তার সৈন্যদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও আদর্শ, অথচ মার্কিন সৈন্যরা তাদের পিঠের ব্যাগ নিয়ে মার্কিন ঘাঁটি থেকে পালিয়ে অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কেউ কেউ আঞ্চলিক হোটেলগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক কর্মীরা নিজেদের জন্য মানবঢাল তৈরি করে বেসামরিক নাগরিক এবং শহরের স্থাপনাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে।”
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ট্রাম্প মিথ্যা দাবি করেছেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কমে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে, অথচ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় আরও শক্তিশালী এবং মার্কিন ঘাঁটি ও জায়নবাদী শাসনের দিকে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় নিক্ষেপ করা হচ্ছে, যার একেকটি ওয়ারহেড এক টনেরও বেশি।”
নায়িনি আরও বলেন, “অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে ঘনঘন সাইরেন বাজার পরিস্থিতি, বসতি স্থাপনকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে বাঙ্কারে বন্দি থাকা এবং বিমানবন্দরগুলোতে পালানোর চেষ্টাকালে ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে সংঘর্ষ যুদ্ধের ময়দানের প্রকৃত চিত্র আরও ভালোভাবে তুলে ধরে।”
আইআরজিসি মুখপাত্র জানান, “ট্রাম্প ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণকে রাস্তায় নামিয়ে সামাজিক বিপর্যয় ঘটাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আজ তিনি ইরানের সচেতন মানুষের কাছ থেকে রাজপথে কঠোর চপেটাঘাত খেয়েছেন এবং অপরাধী ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইরানিদের ক্রোধ ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়েছে।”
ইরানের নেতৃত্বকে হত্যার চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ট্রাম্প স্বল্পতম সময়ে এবং ন্যূনতম খরচে ইরানের নেতৃত্ব ও উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারদের হত্যার মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিতে এবং আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।”
“তবে ইরানের নেতার যোগ্য ও শক্তিশালী নির্বাচন এবং সামরিক কমান্ডারদের কার্যকর যুদ্ধ ব্যবস্থাপনা তাদের হতাশ ও বিফল করেছে এবং তাদের মিত্রদের মনে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের আশা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে,” তিনি যোগ করেন।
তিনি বলেন, “ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি ইরানের নেতৃত্ব নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবেন এবং তার নোংরা ইচ্ছা অনুযায়ী একজন নেতা নিয়োগ করবেন, কিন্তু আজ একজন আমেরিকা-বিরোধী ও বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব বিপ্লবের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং আমাদের প্রিয় আলি খামেনি আরও তরুণ হয়ে উঠেছেন।”
নায়িনি বলেন, “ট্রাম্প মার্কিন জনগণের কাছে মিথ্যা বলে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, কিন্তু এখন আমাদের পাল্টা জবাব তাকে বিভ্রান্ত ও অসহায় করে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে তিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, অথচ যুদ্ধের প্রথম নয় দিনেই তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আজও তিনি তার অংশীদারদের ওপর প্রভাব ফেলা আকাশচুম্বী তেলের দাম থেকে বাঁচতে কৃত্রিম উপায় অবলম্বন করছেন।”
জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়িনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “যদি ইরানি জনগণ এবং পরিষেবা অবকাঠামোর ওপর মার্কিন সেনাবাহিনী ও জায়নবাদী শাসনের আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তাহলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চল থেকে শত্রু পক্ষ এবং তাদের অংশীদারদের কাছে এক লিটার তেলও রপ্তানি করতে দেবে না। যুদ্ধকালীন বাণিজ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।”
তিনি চ্যালেঞ্জে ছুড়ে দিয়ে বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনী হরমুজ প্রণালী অঞ্চলে মার্কিন নৌ-বহরের জন্য অপেক্ষা করছে এবং বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড ফোর্ড-এর অপেক্ষায় আছে।”