পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেহেতু রাজ্যের উত্তরবঙ্গ থেকে প্রথম দফার ভোট শুরু হচ্ছে তাই বুধবার উত্তরবঙ্গ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছেন মমতা। এদিন উত্তরবঙ্গের দুই জেলায় একদিনে তিনটি জনসভা করেন মমতা।
বুধবার প্রথম সভাটি ছিল জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী রামমোহন রায়ের সমর্থনে। দুপুরে ময়নাগুড়ি টাউন ক্লাব ময়দানে এই প্রচারণা ছিল মুখ্যমন্ত্রীর। দ্বিতীয়টি ছিল ওই জেলারই ডাবগ্রাম ফুলবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী রঞ্জনশীল শর্মার সমর্থনে। শেষ নির্বাচনী প্রচার ছিল দার্জিলিং জেলার মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী শঙ্কর মালাকারের সমর্থনে। তিনটি সভা থেকেই এক সুরে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করেন মমতা।
তৃণমূল কংগ্রেসকে কেন ভোট দেবেন, আর বিজেপিকে কেন ভোট দেবেন না- তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মমতা বলেন, “যদি এনআরসি না চান, ডিটেনশন ক্যাম্প না চান, চা বাগান রাখতে চান, এলাকায় শান্তি রাখতে চান, বিনামূল্যে রেশন, স্বাস্থ্য সাথী, সন্তানদের শিক্ষা লক্ষ্মীর ভান্ডার চাইলে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিন। তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো বিকল্প নেই। আর ওরা (বিজেপি) মানুষের জীবন কাড়ে, আমরা মানুষের জীবন ফিরিয়ে দিই। ওরা মানুষকে নোট বাতিল, আধার কার্ড, এসআইআর নিয়ে লাইনে দাঁড় করায়।”
বিজেপিকে হিংসুটের দল বলে অভিহিত করে মমতা বলেন, “বাংলাতে আপনাদের অনেক নারীদের নাম কেটে দিয়েছে। মেয়েরা বিয়ে করে শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ায় তাদের পদবী পরিবর্তন হয়েছে, তার ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে তাতেই সবার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এসআইআর লাইন দিতে দিতে ২২০ মানুষের প্রাণ গেছে, আজকে তাদের আত্মা কাঁদছে। আজ তার জবাব বিজেপিকে দিতে হবে। আজ আমাদের প্রমাণ দিতে হচ্ছে এদেশের নাগরিক কিনা! প্রত্যেকটা চক্রান্ত রুখে দেওয়ার জন্য মহিলা সমাজ তৈরি আছে।”
মমতার অভিযোগ, “ওরা (বিজেপি) মা-বোনেদের উপর অত্যাচার করেছ, এসআইআর বা ভোটার তালিকায় সংশোধন- এর নামে তাদের নাম বাদ দিয়ছে। ওরা আজকে সংবিধান মানছে না, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার মানছে না। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। আর কালকে বলবে এনআরসি- এর নামে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখব। আমি বেঁচে থাকতে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না। এমনকি আমার পরেও পরবর্তী প্রজন্ম কোনদিন তাতে সায় দেবে না।”
তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগ, “বিহারের চারটে জেলা পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলা নিয়ে আপনি আলাদা রাজ্য গঠন করতে চান? অর্থাৎ আপনারা বাংলার মানুষকে আবার প্রধানত করতে চান। কোনো ভাগাভাগি করতে দেব না।”
বিজেপিকে নিশানা করে মমতা বলেন, “এরা হলো ভ্যানিশ পার্টি। কখনো শুনেছেন নির্বাচন কমিশন নোটিফিকেশনে বিজেপির চিহ্ন দেওয়া হচ্ছে? কেন্দ্রীয় বাহিনী বিজেপির দলীয় পতাকা নিয়ে যাচ্ছে? এদের লজ্জা করে না? বিজেপির নেতৃবৃন্দকে গলায় দড়ি দিয়ে মরা উচিত।”
আত্মবিশ্বাসী মমতা জানান, “যতই করো হামলা আবার জিতবে বাংলা। চার তারিখে গণনা হবে। এক দুই তিন চার- বিজেপির হবে হার। এক দুই তিন চার- তৃণমূল জিতবে আবার। বিজেপিকে বিদায় দিন না দিলে দেশটাকে বিক্রি করে দেবে। নির্বাচনের পর পোস্টার লাগিয়ে বলতে হবে, আমি বিজেপি করি না।”
মমতা বলেন, “আমরা কোভিড-১৯ দেখেছি, এরা কোভিড থেকেও ভয়ংকর। এরা ইচ্ছে করে দাঙ্গা বাঁধায়, দুর্ভোগ করে।”
তিনি চ্যালেঞ্জ দিলে বলেন, “আহত বাঘ, সুস্থ বাঘের থেকেও অনেক ভয়ংকর। আগামী দিন তোমাদের বোঝাব। বাংলা দখল করে দিল্লি দখল করব। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।”
মমতার পাশাপাশি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং মমতার ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জিও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার পাথরপ্রতিমা থেকে তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। নির্বাচনী প্রচারণার সূচি অনুযায়ী আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত মোট ১৮ টি নির্বাচনী জনসভায় অংশ নেবেন মমতা। অন্যদিকে আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২৫ টি জনসভায় অংশ নেবেন অভিষেক।
আগামী ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে ১৫২ আসনে প্রথম দফায় বিধানসভার ভোট গ্রহণ, দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল দক্ষিণবঙ্গের ১৪২ আসনে ভোট নেওয়া হবে। ৪ মে হবে ভোট গণনা।