পশ্চিমবঙ্গে আরো একটি মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে চলেছে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। আসন্ন নির্বাচনে রাজ্যটির ২৯৪ সদস্যের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৮৪–১৯৪টি আসন জিততে পারে বলেও আভাস মিলেছে একটি জনমত জরিপে।
সর্বভারতীয় গণমাধ্যম ‘সিএনএন-নিউজ ১৮’ প্রকাশিত ভোট-ভাইব নামে একটি সংস্থার জরিপ অনুসারে, ২০২১ সালের নির্বাচনী সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে আসন্ন নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি ৯৮–১০৮টি আসন পেতে পারে। যদিও মমতা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা থেকে তারা অনেকটাই পিছিয়ে থাকবে।
প্রাক-নির্বাচনী জরিপ অনুযায়ী, কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টসহ অন্যান্য দলগুলো মাত্র ১-৩টি আসন পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জরিপ অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস শতকরা ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে বিজেপি ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পেতে পারে। এর অর্থ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রবণতার প্রতিফলন ঘটবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রবণতা অনুযায়ী, মুসলিমদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি এখনো ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। জরিপ বলছে, শতকরা ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ মুসলিমের প্রথম পছন্দ ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল। আবার তফসিলি উপজাতিদের মধ্যে বিজেপির প্রতি জোরালো সমর্থন রয়েছে, যার শতকরা হার ৫১ শতাংশ। যদিও মতুয়া সম্প্রদায়, তফসিলি জাতি ও দলিত ভোটারদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে, যেখানে ৪৩ শতাংশ ভোটার বিজেপিকে এবং ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার তৃণমূলকে সমর্থন করছে। বাম এবং কংগ্রেস সম্মিলিত ভাবে মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেতে পারে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতার পাল্লাই ভারী। রাজ্যটির পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পছন্দের তালিকায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। তার পরেই আছেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী, যার সমর্থন ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ। সিপিআইএম নেতা মোহাম্মদ সেলিম ৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী ৩ দশমিক ৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে অনেকটাই পিছিয়ে আছেন।
রাজ্যের পুরুষদের (৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ) তুলনায় নারী ভোটাররা (৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ) মমতার প্রতি সামান্য বেশি সমর্থন দেখিয়েছেন। মুসলিম সম্প্রদায় মমতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি, যাদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ তাকে সমর্থন করেন, অন্যদিকে তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ শুভেন্দু অধিকারীর দিকে নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
যেই ইসুগুলো এবারের নির্বাচনের আলোচনার প্রধান কেন্দ্র হতে চলেছে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা বেকারত্ব। ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, বেকারত্বই সবচেয়ে জরুরি উদ্বেগ হিসেবে তালিকায় উঠে এসেছে। এর পরেই রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা এবং নারী নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি। ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতার অভিমত এই দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পিছনে রয়েছে কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ, কসবা আইন কলেজে নারী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ। ১০ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতার মতে মূল্যবৃদ্ধি এবং ১০ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতার মতে দুর্নীতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়া বিধায়ক এবং ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’র (এজেইউপি) চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির একটা বড় কারণ হতে পারে বলে জরিপে উঠে এসেছে। ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যে, তৃণমূলের মুসলিম ভোটের ভাগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ এর পিছনে রয়েছে নতুন দল গঠন করে হুমায়ুন কবিরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। সর্বোপরি এজেইউপি'র সাথে আবার জোট সঙ্গী হয়ে ‘অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন’ (এআইএমআইএম) দলের নির্বাচনে লড়াই করার ঘোষণা দেওয়া। যদিও শতকরা ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যে হুমায়ূন কবির বিজেপির সমর্থনপুষ্ট। মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতার অভিমত হুমায়ূনের এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে তৃণমূলের হাত।
বিগত পাঁচ বছরে বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকারের কর্মক্ষমতার বিষয়টিও নির্বাচনী ইস্যু হতে পারে। সরকারের কর্মক্ষমতা নিয়ে ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা ‘খুব ভালো’ বা ‘ভালো’ বলে রেটিং দিয়েছেন, যেখানে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা একে ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’ বলে অভিহিত করেছেন। আর এই ছবিতেই পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে সরকারের কর্মক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও ব্যাপক অসন্তোষ আছে।
জরিপ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিজেপির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। ১৭ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতার অভিমত দলে একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতার অভাব। প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার মনে করেন যে দলটি বাংলার সংস্কৃতি, অস্মিতা বোঝে না। ১০ দশমিক ১ শতাংশের অভিমত দুর্বল সংগঠন এবং ১২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের অভিমত, সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে বিজেপি দলের মর্মস্পর্শী বার্তার অভাব দলটির সমস্যা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল ১৫২ আসনে এবং দ্বিতীয় ও শেষ দফায় ২৯ এপ্রিল ১৪২ আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গণনা হবে ৪ মে।