ইরান যুদ্ধের ইতি টানার নানা চেষ্টার মধ্যে কথায় কথায় বাঁক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলতে চাইছেন, তা খুবই পরিষ্কার; আর তা হলো, এই যুদ্ধে ইরান পরাজিত, ‘তারাই শান্তির চুক্তি ভিক্ষা চাইছে’।
অবশ্য ইরানের পক্ষ থেকে চুক্তির জন্য তিনটি শর্ত বেঁধে দেওয়ার পর ট্রাম্প ও তার শীর্ষ কর্মকর্তারাও একেক সময় একেক কথা বলে চলেছেন। যেখানে তেহরান বারবার বলছে, কোনো সমঝোতা হয়নি।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) হোয়াইট হাউসে যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেওয়ার প্রসঙ্গে ট্রাম্প বক্তব্য রেখেছেন। যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ইরান যুক্ত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিষয়টি উড়িয়ে দেন তিনি।
উপরন্তু নিজেকে চুক্তির নিয়ন্ত্রক দাবি করে তিনি বলেন, “রেকর্ডটা পরিষ্কার করে বলি। তারাই চুক্তি ভিক্ষা চাইছে, আমি না। আর ওখানে কী ঘটেছে, সেটা যারা দেখেছে, তারা সবাই জানে, কেমন। ”
‘ইরান চুক্তি ভিক্ষা চাইছে’ বলেই ক্ষান্ত হননি ট্রাম্প; উল্টো ভাব নিয়ে আরো বলেছেন, “আমরা সেটা (চুক্তি) করতে পারব কি না, জানি না। আমরা সেটা করতে রাজি কি না, তাও জানি না।”
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ‘একপক্ষীয়’ যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে ‘একপক্ষীয় ও অন্যায্য’ বলে বর্ণনা করেছে ইরান। তবে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে, সামনে এগোনোর একটি পথ এখনো তৈরি হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, প্রস্তাবটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পর্যালোচনা করেছেন, যার মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির একজন প্রতিনিধিও রয়েছেন।
তিনি বলেন, “সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে- অস্পষ্ট একটি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনার বিনিময়ে ইরানকে নিজেদের আত্মরক্ষার সক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে।”
“এতে সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম শর্তগুলোও নেই, এবং এখনো কোনো আলোচনার কাঠামোই তৈরি হয়নি। বাস্তবসম্মত আলোচনারও কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না,” যোগ করেন ওই ইরানি কর্মকর্তা।
এদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয় পক্ষের মধ্যে ‘একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে’ কাজ করছে।
ইরানের আলোচকরা ‘দারুণ’ কিন্তু যোদ্ধারা ‘দুর্বল’ ট্রাম্প দাবি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের সামরিক শক্তি অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমরা ইরানকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিচ্ছি। তারা পরাজিত; তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। এখন তাদের চুক্তি করার সুযোগ আছে, তবে সেটা তাদের ব্যাপার।”
“আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদ ধ্বংস করছি, তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গুঁড়িয়ে দিচ্ছি। আমরা তাদের নৌবাহিনী, তাদের বিমানবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছি এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি অংশ, আর ৯০ শতাংশ লঞ্চারও ধ্বংস করেছি,” যোগ করেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, “ইরানের নেতারা বোকা নন। একভাবে না একভাবে তারা খুবই বুদ্ধিমান এবং তারা দারুণ আলোচক।”
ট্রাম্প বলেন, “আমি বলি, তাদের যোদ্ধারা দুর্বল কিন্তু আলোচকরা দারুণ। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত সময়সূচির চেয়েও অনেক এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ মূলত চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে চায়, যার চতুর্থ সপ্তাহ শেষ হচ্ছে শনিবার (২৮ মার্চ)।
ইরানকে শান্তি চুক্তিতে রাজি করানোর ‘জোরালো ইঙ্গিত’ দেখছেন উইটকফ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, ইরানকে শান্তি চুক্তিতে রাজি করানো যেতে পারে, এমন ‘জোরালো ইঙ্গিত’ রয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন, ওয়াশিংটন মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরানের কাছে ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে।
তিনি একটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, “ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা আমরা দেখব এবং আমরা ইরানকে বোঝাতে পারি কি না যে, এটাই তাদের জন্য একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত, যেখানে আরো মৃত্যু ও ধ্বংস ছাড়া অন্য কোনো ভালো বিকল্প নেই। আমাদের কাছে শক্ত ইঙ্গিত আছে যে, এটি সম্ভব।”
মার্কিন এই দূত আলোচনায় ‘গড়িমসি’ করার জন্য ইরানকে দায়ী করেন এবং বলেন, বারবার আলোচনায় বসার মার্কিন অনুরোধ ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। তার ভাষায়, ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি ‘পথ’ খুঁজছে।
উইটকফ আরো বলেন, এই সংঘাত শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করতে আগ্রহী— এমন একাধিক পক্ষ অঞ্চলটির ভেতর ও বাইরে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
তিনি আরো জানান, ইরান মার্কিন আলোচকদের বলেছে, তাদের কাছে ৪৬০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে; যা দিয়ে ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।
আলজাজিরা লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ইরান অত্যন্ত সন্দিহান। কারণ গত এক বছরে শান্তি আলোচনা চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর দুবার বোমা হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাটি বর্তমান যুদ্ধের সূচনা করে।
ইরানের নৌবাহিনী নেই, নৌবাহিনীর নেতাও নেই: পেন্টাগন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, “এটি একটি অন্তহীন যুদ্ধ নয়; বরং স্পষ্ট লক্ষ্যসহ একটি সিদ্ধান্তমূলক অভিযান, যার উদ্দেশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং নিশ্চিত করা যে, তারা কখনোই যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।”
তিনি এটিকে ইতিহাসের পাতায় থাকার মতো ঘটনা এবং খাঁটি আমেরিকান সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিশনে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও এগিয়ে আছে।
হেগসেথ দাবি করেন, “ইরানের এখন কোনো নৌবাহিনী নেই, নৌবাহিনীর কোনো নেতাও নেই।”
যুক্তরাষ্ট্রের ধীরগতির ও নিচু দিয়ে উড়া বিমান ব্যবহারই প্রমাণ করে যে, ইরানের আর কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই, যোগ করেন তিনি।
“যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তি চুক্তির জন্য ভীষণ চেষ্টা করছে এবং ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিকে স্বাগত জানায়,” যোগ করে হেগসেথ আরো বলেন, “যুদ্ধ হলো অন্য উপায়ে আলোচনা।”
ইরান ‘উপহার’ হিসেবে ১০টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে: ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে আলোচনায় তারা যে আন্তরিক, তা দেখাতে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১০টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, যা তারা ‘উপহার’ হিসেবে দিয়েছে।
এই সপ্তাহের শুরুর দিকে তেহরানের একটি ‘উপহার’ নিয়ে দেওয়া তার রহস্যময় মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, প্রথমে ইরান এই সপ্তাহে আটটি বড় তেলের জাহাজ ওই জলপথ দিয়ে যেতে দেয়, পরে আরো দুটি যেতে দেয়।
তিনি আরো জানান, এসব ট্যাঙ্কারের মধ্যে কিছু পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজও ছিল।
ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে ন্যাটোকে আক্রমণ ট্রাম্পের ন্যাটো ও ডেমোক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প।
আলজাজিরা লিখেছে, দেশের ভেতরেও ট্রাম্প সমস্যার মুখে পড়ছেন। এসব সমস্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বিমানবন্দরে নিরাপত্তা পার হতে দীর্ঘ লাইন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, জ্বালানির দাম অনেক বেশি হয়ে যাওয়া।
ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভা থেকে আশ্বাস চান যে, তিনি ভালো কাজ করছেন।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে অ্যালান ফিশার আলজাজিরায় লিখেছেন, “আমার সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলো এখনো মনে করে, ট্রাম্প চান এই যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমার মধ্যেই শেষ হোক; যেটা তিনি আগেই বলেছিলেন। তিনি বলতে চান, “দেখো, কাজটা হয়ে গেছে। আমি আগেই বলেছিলাম। আমি ঠিক ছিলাম।”
অ্যালাম ফিশার আরো লিখেছেন, ট্রাম্প স্পষ্টতই এখনো ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন, ওই অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করছেন।
তিনি লিখেছেন, “আমরা বুধবার ঘোষিত নতুন সেনা মোতায়েনের কথা বলছি, যেখানে আরো মেরিন সেনা পাঠানো হয়েছে। এমনও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে, কোনো একসময় স্থলসেনা মোতায়েন হতে পারে। তবে সম্ভবত মূল ভূখণ্ড ইরানে নয়, বরং খার্গ দ্বীপে।”
ট্রাম্প তার পোস্টগুলোতে ন্যাটোর কথাও বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, সংস্থাটি তাকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিচ্ছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটোর প্রয়োজন নেই। তবে সঙ্গে এটাও যোগ করেন যে, “এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কখনো ভুলে যেও না।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অশনিসংকেত বলেই মনে হচ্ছে।
হামলার পর ‘নিয়ম বদলে গেছে’: বিশ্লেষক মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রস হ্যারিসন বলেছেন, আগে যে কাঠামোতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনা হতো, সেটি এখন আর প্রযোজ্য নয়।
তিনি বলেন, দুই পক্ষের মূল যুক্তি সবসময় লেনদেনভিত্তিক ছিল। ওয়াশিংটন চাইতো পারমাণবিক বিষয় নিয়ন্ত্রণে থাকুক, আর তেহরান চাইতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা। কিন্তু চলমান যুদ্ধ সেটি ব্যাহত করেছে।
হ্যারিসন আলজাজিরাকে বলেছেন, “এবার তাদের ওপর হামলা হয়েছে, তাই নিয়ম বদলে গেছে।”
“আপনি যদি ধরে নেন, জেনেভায় আগে যেসব পয়েন্ট ছিল, সেগুলো নিয়েই ফিরে এসে কোনো চুক্তি হবে, সেটা মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। ইরান বদলে গেছে। তারা যুদ্ধক্ষেত্র নিজের মতো গঠন করেছে। আর আমেরিকাও ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তন করছে।”
ফেব্রুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হয়, যা বর্তমান যুদ্ধের কারণ।
টার্গেটেড হত্যাকাণ্ডকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার সম্পর্কে হ্যারিসন বলেন, “হত্যাকাণ্ড আসলে ইরানের অবস্থান আরো কঠোর করেছে। আমরা এটা দেখেছি।”