ইরান ও ইসরায়েল-মার্কিন বাহিনীর মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার এক মাস পর ইয়েমেনের হুতিরা প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে।
রবিবার (২৯ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা শনিবার (২৮ মার্চ) ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ইসরায়েলে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে এই লড়াইয়ে সরাসরি যুক্ত হয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হামলাগুলো প্রতিহত করা হয়েছে, তবে ইরানপন্থি এই গোষ্ঠীটি ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক এবং ইরানের ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টগুলোর’ সমর্থনে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
ইসরায়েলের গাজা অভিযানের সময় লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির করে দিলেও, বর্তমান সংঘাতে হুতিরা এতদিন শান্ত ছিল। তাদের এই অংশগ্রহণ এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরান বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, হুতিরাও বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধ করে লোহিত সাগরের বাণিজ্য পুনরায় অচল করে দেবে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় কর্মরত আল জাজিরার সাংবাদিক ইউসুফ মাওরি বাব আল-মান্দেবকে হুতিদের ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা ইসরায়েলকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। তারা তাদের আমদানি-রপ্তানি এবং বাণিজ্য পথগুলো বিপর্যস্ত করতে চায়।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শেষ করার আশা করছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কৌশলে ‘সর্বোচ্চ’ নমনীয়তা দিতে অঞ্চলে নতুন করে মার্কিন মেরিন সেনা মোতায়েন শুরু হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শনিবার রাতে তেহরানে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জানজানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় একটি আবাসিক ইউনিটে অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি আক্রান্ত হওয়ায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ওই অঞ্চলের মার্কিন ও ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৩০ জন শিশু।
হামলায় ৯৩ হাজারেও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে লেবাননেও ইসরায়েলি ধ্বংসলীলা অব্যাহত রয়েছে। ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ১৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহকে নির্মূল করতে এবং ‘গাজা মডেলের’ মতো একটি বাফার জোন তৈরি করতে লিটানি নদীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শনিবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় তিনজন সাংবাদিক এবং ৯ জন প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন।
সামনে নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে। তবে তিনি আলোচনার জন্য ইরানকে আরও ১০ দিন সময় দিয়েছেন।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে এই সংকট নিয়ে আলোচনায় বসবেন। ইতিমধ্যে ইরান ২০টি পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে, যাকে জ্বালানি সংকট নিরসনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।