২০২৪ সালের ৯ আগস্ট। কর্তব্যরত অবস্থায় কলকাতার আরজিকর মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুনের শিকার হতে হয় এক চিকিৎসক ছাত্রীকে (কল্পিত নাম ‘অভয়া’)।
ওই ঘটনায় গোটা ভারত জুড়ে আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তি প্রদানের দাবিতে আন্দোলন, মিছিল, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, রাত জাগো- একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল। সেই থেকে টানা দেড় বছর ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় আইন, আদালত, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সেই অভয়ার বাবা-মা। কিন্তু ন্যায় বিচারে মেলেনি।
অবশেষে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা এবং একই সঙ্গে নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সেই অভয়া’র মা’ই এখন নির্বাচনের প্রার্থী। নিজের বিধানসভা কেন্দ্র উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি থেকে লড়াই করবেন রত্না দেবনাথ।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, “এটাও একটা জয়, পানিহাটিবাসীর জন্য জয়। এই নির্বাচনে পানিহাটির মানুষ জিতবে।”
প্রার্থী হওয়ার পরই সকাল-বিকাল এক করে জনসংযোগ করে চলেছেন তিনি। নির্বাচনি প্রচারণায় বেরিয়ে স্থানীয় নারীদের খোঁজ নিচ্ছেন, আর তাকে কাছে পেয়ে স্থানীয় নারীরও যেন নতুন করে লড়াই করার শক্তি অর্জন করছেন। অনেক নারীদের আবার তাকে জড়িয়ে ধরে অভয়ার মৃত্যুতে সান্ত্বনা দিতে দেখা গেছে।
রত্নার বক্তব্য, “মানুষের কাছে আমি বলতে চাই যে, আমার কিছু পাবার নেই, কিন্তু দেওয়ার অনেক কিছু আছে। আপনারা আমার পাশে এসে দাঁড়ান। আপনারা জিতলে পানিহাটির অবস্থাটাই পাল্টে যাবে।”
অনেকেই বলছেন, এই রত্না দেবনাথকে প্রার্থী করে মমতার দলের বিরুদ্ধে ট্রাম্প কার্ড খেলেছে বিজেপি। মেয়ের নৃশংস মৃত্যুর ঘটনায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকেই নিশানা করেছিলেন অভয়ার বাবা-মা। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিশ মন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগও দাবি করেছিলেন তিনি। আন্দোলনের ঢেউ এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বিরোধীদল এবং প্রতিবাদী সাধারণ মানুষ- সকলের মুখেই ছিল একটিই স্লোগান- ‘দফা এক, দাবি এক; মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ।’ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সেই নির্যাতিতার মাকে প্রার্থী করে কি সরাসরি মমতাকেই চ্যালেঞ্জ জানালো বিজেপি?
স্থানীয় পানিহাটি কেন্দ্রের বাসিন্দা কৌশিক ঘোষ জানান, “অভয়ার মাকে প্রার্থী করাটা বিজেপির জন্য অবশ্যই বাড়তি সুবিধা। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তার দল ভয় পেয়েছে, এই বিষয়ে আমি একমত নই। কারণ তিনি উদ্যাম ঝড়ে লড়তে লড়তে আজকে এখানে এসে পৌঁছেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভয় পাওয়ার মানুষ নয়।”
নারী মুখ্যমন্ত্রীর শাসনামলে রাজ্যের নারীদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলেছেন পানিহাটি বিজেপির নারী প্রার্থী রত্না দেবনাথ। তার অভিযোগ, “শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী সুরক্ষাসহ মানুষের মৌলিক অধিকার এই রাজ্যের সরকার কেড়ে নিয়েছে। প্রত্যেকটা ঘটনা ঘটলেই আমাদের নারী মুখ্যমন্ত্রী বলেন মেয়েরা কেন রাতে বাইরে বেরোবে? আমি এগুলো থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য মেয়েদের হয়ে সরব হতে চাই। আমি নারীদের সুরক্ষা দিতে চাই।”
তবে কেবল পানিহাটিই নয়, মুখ্যমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্র দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে দলের প্রার্থী ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী হয়ে প্রচারণার কথা ভাবছে বিজেপি। পাশাপাশি আরো বেশ কিছু কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীদের হয়ে প্রচারণায় দেখা যেতে পারে রত্ন দেবনাথকে। সেক্ষেত্রে অভয়ার মাকে দিয়েই সরাসরি মমতাকে চ্যালেঞ্জে জানাতে চায় গেরুয়া শিবির। রাজ্যের তৃণমূলের ভোটারের একটা বড় অংশ নারী। আর সেই নারীদের মন জয় করতে রত্নাদেবীই ভরসা বিজেপির।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, “আমি দিদিকে বলেছি পানিহাটিতে সময় দেওয়ার পরে যদি একদিন বা দুদিন সময় থাকে তবে ভবানীপুরে গিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিশ মন্ত্রী এবং তৃণমূলের ঘোষিত প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আপনার যা অভিযোগ সেটা তুলে ধরতে।” শুভেন্দু আরও বলেন, “পানিহাটির শিক্ষিত মানুষ রেকর্ড ভোটে তাদের প্রার্থীকে জেতাবে।”
শুভেন্দুর স্পষ্ট বক্তব্য, “রাজ্যের মানুষ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার দেখেছেন, গত ১৫ বছর ধরে একটা সরকার দেখেছেন, আগামী ৫ বছর পদ্মফুলকে ভোট দিয়েই দেখুন না। যদি ভালো না লাগে সরিয়ে দেবেন।”
দলের প্রার্থীর জয় নিয়ে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার। রবিবার পানিহাটি কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের ফাঁকে তিনি জানান, “উনার মেয়ের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, পানিহাটির মানুষ ওই ঘটনার প্রতিবাদে দু'হাত তুলে তাকে আশীর্বাদ করবেন এবং সমর্থন করবেন।”
এনিয়ে পাল্টা বিজেপিকে প্রার্থীকে নিশানা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য স্তরের মুখপাত্র সম্রাট চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “আপনি তিলোত্তমার মা। আপনি আমাদের অত্যন্ত কাছের। আপনার মানসিক দুঃখ-যন্ত্রণা ভোলানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। আপনি রাজনীতিতে এসেছেন, রাজনীতিতে আসার অধিকার রয়েছে। ভোটের লড়াইয়ে আসুন, সত্যি কথা বলুন।”
উল্লেখ্য, ভারতের নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করেছে, সে অনুযায়ী রাজ্যটিতে ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল- এই দুই ধাপে ভোটগ্রহণ করা হবে। এই রাজ্যে প্রথম ধাপে ১৫২ আসনে এবং দ্বিতীয় ধাপে ১৪২ আসনে ভোট নেওয়া হবে।
আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোটে এই পানিহাটি কেন্দ্রে নির্বাচন। এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী রত্না দেবনাথের প্রধান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ, অন্যদিকে বামেদের প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত। ভোট গণনা ৪ মে।