ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম মাসে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি তেল ও গ্যাস কোম্পানি প্রতি ঘণ্টায় তিন কোটি ডলারেরও বেশি অনার্জিত মুনাফা আয় করেছে। এই বিপুল লাভের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরামকো, গ্যাজপ্রম এবং এক্সনমোবিল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান (১৫ এপ্রিল) বুধবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত মার্চ মাসে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি গড়ে ১০০ ডলারে পৌঁছে দেয়। এর ফলে কোম্পানিগুলো ওই মাসে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের অপ্রত্যাশিত যুদ্ধকালীন মুনাফা অর্জন করে। তেল ও গ্যাসের সরবরাহ যুদ্ধপূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগবে এবং তেলের দাম গড়ে ১০০ ডলার থাকলে কোম্পানিগুলো বছরের শেষ নাগাদ ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার আয় করবে। এই বিশ্লেষণে শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জির তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা গ্লোবাল উইটনেসের মাধ্যমে বিশ্লেষিত।
এই অতিরিক্ত মুনাফা আসে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। কারণ তারা তাদের যানবাহনে জ্বালানি ভরতে এবং বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চড়া মূল্য পরিশোধ করে। এছাড়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জ্বালানি বিলও বেড়ে যায়। দুর্দশাগ্রস্ত ভোক্তাদের সাহায্য করার জন্য কয়েক ডজন দেশ জ্বালানি কর কমিয়েছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইতালি, ব্রাজিল এবং জাম্বিয়াসহ সেই দেশগুলো জনসেবার জন্য কম অর্থ সংগ্রহ করছে।
তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর যুদ্ধকালীন মুনাফার ওপর অপ্রত্যাশিত কর আরোপের জন্য চাপ বাড়ছে। ইউরোপীয় কমিশন জার্মানি, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল এবং অস্ট্রিয়ার অর্থমন্ত্রীদের একটি অনুরোধ বিবেচনা করছে। সেখানে বলা হয়েছে, “একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, যারা যুদ্ধের পরিণতি থেকে লাভবান হয়, তাদের অবশ্যই সাধারণ মানুষের ওপর থেকে বোঝা কমাতে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে হবে।”
৪ এপ্রিলের একটি চিঠিতে মন্ত্রীরা বলেছেন, “এটি সরকারি বাজেটের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়েই, বিশেষ করে ভোক্তাদের জন্য অস্থায়ী ত্রাণে অর্থায়ন করা এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি রোধ করা সম্ভব করবে।”
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইইউ-এর জীবাশ্ম জ্বালানির বিল ২ হাজার ২০০ কোটি ইউরো বেড়েছে।
আরামকো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় লাভবান। যদি তেলের গড় মূল্য ১০০ ডলার থাকে, তবে ২০২৬ সালে কোম্পানিটি আনুমানিক ২ হাজার ৫৫০ কোটি ডলারের যুদ্ধকালীন মুনাফা অর্জন করবে। এর পাশাপাশি, সৌদি আরবের প্রধানত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই কোম্পানিটি নিয়মিতভাবে বিপুল মুনাফা করে আসছে- ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যা ছিল প্রতিদিন ২৫ কোটি ডলার। সৌদি আরব কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু পদক্ষেপকে বাধা দিতে এবং বিলম্বিত করতে সফল প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
তিন রুশ কোম্পানি – গ্যাজপ্রম, রসনেফট এবং লুকোইল – বছরের শেষ নাগাদ ইরান যুদ্ধ থেকে আনুমানিক ২ হাজার ৩৯০ কোটি ডলার মুনাফা করতে চলেছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সংঘাত ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য তার কোষাগারকে সমৃদ্ধ করেছে। মার্চ মাসে রাশিয়া প্রতিদিন ৮৪ কোটিন ডলার তেল রপ্তানি থেকে আয় করেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
মার্কিন তেল কোম্পানি এক্সনমোবিলের জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। যদি ১০০ ডলারের মূল্য বজায় থাকে তবে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অনার্জিত যুদ্ধ মুনাফা আয় করবে। আরেক তেল কোম্পানি শেল পাবে ৬৮০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত মুনাফা। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরের মাসে শেয়ারের দাম বাড়ার কারণে অন্যান্য কোম্পানির মতো এই দুটি কোম্পানির মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে: এক্সনমোবিলের মূল্য ১১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার এবং শেলের মূল্য ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বেড়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শেভরন ইরান যুদ্ধ থেকে ৯২০ কোটি ডলারের অপ্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের পথে রয়েছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মাইক উইর্থও লাভবান হয়েছেন, তিনি জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যের শেভরন শেয়ার বিক্রি করেছেন।